ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা (৯) দাবি নিয়ে রাজপথে

প্রকাশিতঃ 2:11 am | July 31, 2018 | ২০

বাসচাপায় শহীদ রমিজ উদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের দুই শিক্ষার্থীকে হত্যার ঘটনায় বিক্ষোভে ফেটে পড়েছে হাজার হাজার শিক্ষার্থী। রবিবারের মতো গতকাল সোমবার সকালেও বিমানবন্দর সড়কে নেমে বিক্ষোভ শুরু করে সহপাঠীরা। বিভিন্ন স্কুল-কলেজ থেকেও শিক্ষার্থীরা দলে দলে এসে তাদের সঙ্গে যোগ দেয়। বিমানবন্দর সড়কটি অবরোধ করে শতাধিক বাস ভাঙচুর শুরু করে তারা। বিক্ষোভ রাজধানীর আরো এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। ধানমণ্ডির মিরপুর রোড, প্রগতি সরণি, বাড্ডা, বনানী, মোহাম্মদপুর ও মিরপুরের দারুসসালাম রোডসহ কয়েকটি এলাকায় স্থানীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা রাস্তায় নেমে এসে বিক্ষোভ করে। এসব এলাকায় অসংখ্য বাস ভাঙচুর করা হয়। একদল শিক্ষার্থী ক্যান্টনমেন্ট স্টেশনের পাশে রেললাইনেও অবস্থান নেয়। এতে নিরাপত্তাজনিত কারণে দুপুর দেড়টা থেকে ঢাকার সঙ্গে সব ধরনের রেল চলাচল বন্ধ রাখে রেল কর্তৃপক্ষ। দুপুরে ক্যান্টনমেন্ট রেলস্টেশনের স্টেশন মাস্টার মোজাম্মেল হোসেন এ তথ্য নিশ্চিত করেন।

বিক্ষোভরত স্কুল-কলেজের কিশোর-কিশোরী শিক্ষার্থীরা নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খানকে তাঁর এসংক্রান্ত এক বক্তব্যের জন্য দুঃখ প্রকাশ করতে বলে। তারা কলেজের দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্র আবদুল করিম রাজীব ও একাদশ শ্রেণির ছাত্রী দিয়া খানম মীমকে বাসচাপায় হত্যার জন্য দায়ী বাসচালকদের শাস্তিসহ ৯ দফা দাবি তুলে ধরে। দুপুরের পর অভিযুক্ত বাসচালকদের গ্রেপ্তারের খবর জানিয়ে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা বিক্ষোভকারীদের শান্ত করার চেষ্টা করেন। একপর্যায়ে বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে বিমানবন্দর সড়কে অবরোধ তুলে নিয়ে শিক্ষার্থীরা চলে যায়। এর পরও বেশ কিছু সময় মিরপুর ও বাড্ডায় বিক্ষোভ ও ভাঙচুর চলতে থাকে।

এদিকে নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খান গতকাল সচিবালয়ে সাংবাদিকদের বলেছেন, তিনি পদত্যাগ করলেই সব সমস্যার সমাধান হবে না। তিনি দুর্ঘটনা কমাতে ভূমিকা রাখছেন বলেই নৌদুর্ঘটনা কমছে। তিনি দুই শিক্ষার্থীর মৃত্যুর ঘটনায় দুঃখ প্রকাশ করে চালকদের অপরাধ থাকলে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে জানান।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, সকাল সাড়ে ১০টা থেকে রমিজ উদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের শিক্ষার্থীরা বিমানবন্দর সড়ক (র‌্যাডিসন হোটেলের সামনে) অবরোধ করে রাখে। এতে বনানী থেকে উত্তরা এবং মিরপুর হয়ে কালশী থেকে উত্তরা যাওয়ার সড়কগুলো কার্যত অচল হয়ে পড়ে। এই শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সংহতি জানিয়ে ভাসানটেক সরকারি কলেজ, গুলশান কমার্স কলেজ, গুলশান ডিগ্রি কলেজ, মাইলস্টোন কলেজ, বিএএফ শাহীন কুর্মিটোলা, আদমজী ক্যান্টনমেন্ট, ঢাকা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি কলেজ ও বনানী বিদ্যানিকেতন কলেজের ছাত্র-ছাত্রীরা সড়ক অবরোধে যোগ দেয়। দেখা গেছে, বিক্ষোভকারী শিক্ষার্থীদের বয়স ছিল আনুমানিক ১০ থেকে ২২ বছরের মধ্যে। কারো কারো হাতে বাঁশ ও কাঠের লাঠি ছিল। বাস দেখলেই ধর ধর বলে চিৎকার করে দল বেঁধে এগিয়ে যাচ্ছিল তারা। এরপর কাচ গুঁড়িয়ে দিচ্ছিল। তবে তারা ব্যক্তিগত গাড়ি, অ্যাম্বুল্যান্স আর হজযাত্রীদের গাড়ি ছেড়ে দেয়। কয়েকটি স্থানে প্রাইভেট কার ও মোটরসাইকেলে বাধা দেওয়া হলেও ভাঙচুর করা হয়নি।

এদিকে সকাল ১১টা থেকে ধানমণ্ডির সায়েন্স ল্যাবরেটরি মোড়ে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করে ঢাকা কলেজ, সিটি কলেজ, আইডিয়াল কলেজ ও গভর্নমেন্ট ল্যাবরেটরি স্কুলের শিক্ষার্থীরা মিরপুর সড়ক অবরোধ করে রাখে। এতে সড়কের দুই পাশে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এ সময় বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা অনেকগুলো বাস ভাঙচুর করতে থাকে। এ সময় পুলিশ গিয়ে তাদের সড়ক থেকে সরিয়ে দেয়। সেখানে উপস্থিত নিউ মার্কেট থানার ওসি আতিকুর রহমান বলেন, ‘ছাত্ররা রাস্তা অবরোধ করে গাড়ি ভাঙচুর করায় তাদের সরিয়ে দেওয়া হয়।’

‘মা, আমি নিরাপদে বাড়ি ফিরতে চাই’ : বাড্ডায় প্রগতি সরণিতে গুলশান কমার্স কলেজের শত শত শিক্ষার্থী মানববন্ধন করে। তাদের হাতে হাতে ছিল ‘মা, আমি নিরাপদে বাড়ি ফিরতে চাই’, ‘স্টপ কিলিং! মাই মম ইজ ক্রাইং’, ‘ঘাতক ড্রাইভারের হাতে আর কত রক্ত ঝরবে?’, ‘সড়কে মৃত্যুর মিছিল থামাও’—এমনই অসংখ্য স্লোগান লেখা প্ল্যাকার্ড। মানববন্ধনে দাঁড়ানো গুলশান কমার্স কলেজের শিক্ষার্থী বাহাউদ্দিন বলে, ‘সড়কগুলো ক্রমেই লাশের ভাগাড়ে পরিণত হচ্ছে। রক্তের দাগ শুকাতে না শুকাতেই আরেকটি রক্তের দাগ এসে আরো লাল করে দিচ্ছে সড়কগুলো। এভাবে আর কত লাশ পড়বে? বাসা থেকে বের হলেই বাবা-মা চিন্তা করেন। নিজেও অস্থির থাকি বেপরোয়া গাড়ির কবলে পড়ে জীবনের বিনাশ ঘটবে না তো! ঘরে নিরাপদে ফিরতে পারব তো! এ কান্না থামানো দরকার।’ একই কলেজের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষক মিজানুর রহমান বলেন, ‘এত কান্না! তবু রাষ্ট্রের ঘুম ভাঙছে না। আর কত লাশ পড়লে এ হত্যাযজ্ঞ বন্ধ হবে? ঘাতক চালকদের উপযুক্ত শাস্তি নিশ্চিত করতে পারলেই দুর্ঘটনা অনেকাংশে কমে আসবে। আর যেন কোনো শিক্ষার্থীর প্রাণ অকারণে ঝরে না যায়, তার জন্যই আমরা আজ ক্লাস-পরীক্ষা বন্ধ করে রাস্তায় দাঁড়িয়েছি।’

শিক্ষার্থীদের ৯ দফা : বিমানবন্দর সড়কে বিক্ষোভরত রাহাত, মুনতাহিনা, তানজিবসহ কয়েকজন শিক্ষার্থী বলে, এভাবে আন্দোলন না করলে হত্যা চলতেই থাকবে। অবরোধের সময় ৯ দফা দাবি জানায় শিক্ষার্থীরা। এর মধ্যে রয়েছে—নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খানের বক্তব্য প্রত্যাহার করে নিঃশর্ত ক্ষমা প্রার্থনা, বাসচালকদের গ্রেপ্তার ও ফাঁসি, লাইসেন্সবিহীন চালকদের গাড়ি চালানো বন্ধ, ঘটনাস্থলে ফুট ওভারব্রিজ নির্মাণ ইত্যাদি। শিক্ষার্থীরা বলে, বাস থামানোর সিগন্যাল দিলে থামিয়ে তাদের বাসে তুলতে হবে। শুধু ঢাকা নয়, সারা দেশের শিক্ষার্থীদের জন্য হাফ ভাড়ার ব্যবস্থা করতে হবে। ফিটনেসবিহীন গাড়ি রাস্তায় চলাচল বন্ধ ও লাইসেন্স ছাড়া চালকরা গাড়ি চালাতে পারবে না। বাসে অতিরিক্ত যাত্রী নেওয়া যাবে না। এসব দাবি আদায়ের জন্য তারা ২৪ ঘণ্টার আলটিমেটাম দেয়। এ সময়ের মধ্যে ব্যবস্থা না নেওয়া হলে ফের আন্দোলনের ঘোষণা দেয় তারা।

পুলিশ কর্মকর্তারা বারবার শিক্ষার্থীদের বোঝানোর চেষ্টা করলেও কোথাও শিশু-কিশোরদের ওপর চড়াও হয়নি পুলিশ। বিকেল ৪টার দিকে র‌্যাব, পুলিশসহ অন্যান্য আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী শিক্ষার্থীদের বিমানবন্দর সড়ক ছেড়ে দিতে অনুরোধ জানায়। এ সময় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর ইট-পাথর ছুড়তে থাকে বিক্ষুব্ধ ছাত্ররা। এরপর সাড়ে ৪টার দিকে শিক্ষার্থীরা চলে যায়। এরপর পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে যান চলাচল শুরু করে।

মিরপুরে বিক্ষোভ : বিকেল ৫টার দিকে যখন রাজধানীর রাস্তা অনেকটা শান্ত, তখন মিরপুরে বিক্ষোভ শুরু করে কমার্স কলেজের শিক্ষার্থীরা। তারা চিড়িয়াখানা রোড থেকে গাবতলী টেকনিক্যাল মোড় পর্যন্ত সড়কে মিছিল করে। বিকেল সোয়া ৫টায় বাঙলা কলেজের সামনের রাস্তায় জাবালে নূর পরিবহনের আটটি বাস ভাঙচুর করে তারা। ওই সড়কে আরো ১০টি বাসে ভাঙচুর চালাতে দেখা যায়।

নৌমন্ত্রী যা বললেন : নৌমন্ত্রী শাজাহান খান গতকাল সচিবালয়ে সাংবাদিকদের বলেন, ‘দুর্ঘটনা ঘটলেই অনেকে আমার পদত্যাগ দাবি করেন। পদত্যাগ করলেই সমাধান হয়ে যাবে? সব সমস্যার সমাধান হলে আমার যেতে তো কোনো অসুবিধা নেই। পদত্যাগ সমস্যার সমাধান নয়।’ নৌমন্ত্রী বলেন, ‘জাবালে নূর গাড়িতে গতকাল দুই শিক্ষার্থী নিহত হন। বিষয়টি খুবই মর্মান্তিক এবং দুঃখজনক। দুঃখজনক বললেই শেষ হবে না, আমি গতকালও (রবিবার) বলেছি, আজও বলতে চাই—যারা প্রকৃতপক্ষে দোষী তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। এগুলোকে তো কেউ সমর্থন করবে না।’ তিনি আরো বলেন, ‘যারা দোষী তাদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিলে আমাদের মালিক-শ্রমিকদের পক্ষ থেকে কোনো প্রতিবাদ আমরা করতে রাজি নই। এসবের দায়দায়িত্ব আমরা নেব না।’

মন্ত্রী আরো বলেন, ‘কোনো ঘটনায় যাঁরা সংক্ষুব্ধ হবেন তাঁরা বিক্ষোভ প্রদর্শন করতেই পারেন। আমি একে অমূলক বলব না। এর বিরুদ্ধে আমার কিছু বলার নেই। শুধু এটুকু বলব, একটা দুর্ঘটনা ঘটেছে, আমাদের দায়িত্ব হলো এই দুর্ঘটনার সঙ্গে যারা জড়িত তাদের বিচারের ব্যবস্থা করা। আমি ছাত্র বন্ধুদের আশ্বস্ত করতে চাই—এর কঠোর বিচারের ব্যবস্থা হবে। ছাত্র বন্ধুদের বলব, আপনারা অপেক্ষা করুন, আমরা কী করছি দেখেন।’

এদিকে ছাত্রবিক্ষোভের কারণে বিমানবন্দর সড়ক (ভিআইপি রোড), প্রগতি সরণি, মিরপুর রোডসহ শহরের প্রধান সড়কগুলোতে যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। তৈরি হয় তীব্র যানজট। এতে দুর্ভোগে পড়ে কাজে বের হওয়া হাজার হাজার মানুষ। অনেকে হেঁটে গন্তব্যে যায়। রবিবার রাজধানীর কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালের অদূরে বিমানবন্দর সড়কে বাসচাপায় রমিজ উদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের দুই শিক্ষার্থীকে হত্যা করা হয়।