কোমলমতি শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে এখন ষড়যন্ত্র দেখা দিচ্ছে- বলছেন আ.লীগ

প্রকাশিতঃ 3:05 am | August 04, 2018 | ১২২

নিরাপদ সড়কের দাবিতে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে সরকারবিরোধী ষড়যন্ত্র দেখছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। শিক্ষার্থীদের যৌক্তিক আন্দোলনে অনুপ্রবেশ ঘটিয়ে বিএনপি ও তার সাম্প্রদায়িক দোসররা সরকার হঠানোর নিরাপদ সড়ক খুঁজছে বলে মনে করছে দলটি। তাই এ ব্যাপারে দলের নেতাকর্মীদের সতর্ক থাকার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। গত ২৯ জুন বিমানবন্দর সড়কের কুর্মিটোলায় বাসচাপায় নিহত হন রমিজউদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের শিক্ষার্থী দিয়া খানম মিম ও আবদুল করিম রাজিব। এ ঘটনার পর নিরাপদ সড়কের ৯ দফা দাবিতে গত সোমবার থেকে টানা পাঁচ দিন বিভিন্ন সড়ক অবরোধ করে আন্দোলন করছে বিভিন্ন স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা। আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে ঢাকার বাইরে বিভিন্ন জেলা শহরেও। আন্দোলনের প্রথম দিনে কয়েকটি স্থানে গাড়ি ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। তৃতীয় দিনে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা সড়কে গাড়ির কাগজপত্র ও ড্রাইভারের লাইসেন্স চেক করে। এ সময় পুলিশ তাদের কোনো বাধা দেয়নি। সাধারণ মানুষকেও আন্দোলনে সমর্থন দিতে দেখা গেছে। আন্দোলনের বিভিন্ন স্থানে ছাত্রদের সঙ্গে অপেক্ষাকৃত বয়সি যুবকদের দেখা গেছে। ওইসব যুবকদের গাড়ি ভাঙচুরসহ অগ্নিসংযোগের ঘটনায় সম্পৃক্ত হতে দেখা যায়। চতুর্থ দিনে বৃহস্পতিবার শিক্ষার্থীরা সরকারের মন্ত্রী, সচিব, পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, সাংবাদিকসহ সব শ্রেণি-পেশার মানুষের গাড়ির কাগজ ও ড্রাইভিং লাইসেন্স চেক করে। রাজধানীর একাধিক সড়কে ট্রাফিক নিয়মে সারিবদ্ধভাবে গাড়ি চলাচলে উদ্বুদ্ধ করে। বৃহস্পতিবার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকার সুযোগে আন্দোলনে শিক্ষার্থীদের বাইরে বিভিন্ন বয়সি যুবকদের দেখা যায়। যাদের ভূমিকা ছিল উচ্ছৃঙ্খল। অনেক স্থানে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের খাবারসহ বিভিন্ন ধরনের প্ল্যাকার্ড সরবরাহ করতে দেখা যায়। যার অধিকাংশই ছিলো সরকারবিরোধী স্লোগান। কোমলমতি শিক্ষার্থীদের যৌক্তিক আন্দোলনে শুরু থেকে জনগণের সমর্থন থাকলেও চতুর্থ দিনে অনেকেই বিরক্তি প্রকাশ করেন। ঐদিন যারাই গাড়ি নিয়ে বের হয়েছে বারবার যাচাই-বাছাই করার ভোগান্তিতে পড়েছেন। মাতুয়াইলের বাসিন্দা মো. সালাউদ্দিন অভিযোগ করেন- শনির আখড়া ব্রিজে একদল ছাত্র গাড়ির কাগজ, লাইসেন্স দেখল। এরপর ১০ হাত না যেতেই আরেক দল থামালো, সেখানের কাউকে ছাত্র মনে হয়নি, তারা খুবই উচ্ছৃঙ্খল ভাষায় লাঠি হাতে লাইসেন্স না দেখেই, যা ইচ্ছা তাই বললো। ওখান থেকে বের হয়ে ফ্লাইওভারে ওঠা পর্যন্ত অন্তত ১৫ জায়গায় একই আচরণের শিকার হয়েছি। পেছনে চেক করেছে, বারবার বললেও তারা শোনেনি। স্কুল-ড্রেসের বাইরের থাকা যুবকদের আমার ছাত্র মনে হয়নি। একই অভিযোগ মিরপুরের বাসিন্দা মশিউর মামুনেরও। তিনি জানান, বাড়ি থেকে বেরিয়ে রিকশায় চড়ে আগারগাঁও যেতে চেয়েও পারি নাই। মেইন রোডে উঠতেই ছেলেপেলেরা আটকে দিলো। তাদের আচরণ এতটাই উগ্র ছিলো, সামনে যেতে পারিনি। তাদের কাউকে স্কুলছাত্র মনে হয়নি, ভার্সিটিপড়ুয়া মনে হয়েছে। আওয়ামী লীগ সূত্র মতে, নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের যৌক্তিক দাবি সরকার মেনে নিয়েছে। আন্দোলনের শুরু থেকেই সরকার নীরব ভূমিকা রেখেছে। প্রশাসনও ছিলো নিষ্ক্রিয়। আন্দোলনে জনগণের সমর্থন আছে বলেই ৯ দফা দাবি মেনে নেওয়া হয়েছে। কিন্তু এ যৌক্তিক আন্দোলনকে উসকানি দিয়ে ভিন্ন রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করার অশুভ চক্রান্তের গন্ধ পাচ্ছে দলটি। বিএনপি-জামায়াতের অনুপ্রবেশকারীরা আন্দোলনকে পুঁজি করে ফায়দা নেয়ার অপচেষ্টা চালাচ্ছে। যা নিয়ে আওয়ামী লীগের উচ্চপর্যায় উদ্বিগ্ন, বিচলিত। গতকাল শুক্রবার দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সম্পাদকম-লীর সঙ্গে ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণের নেতা, মহানগরের জাতীয় সংসদ সদস্য, দক্ষিণ ও উত্তর সিটি কর্পোরেশনের মেয়র, সব থানার নেতা এবং সহযোগী সংগঠনের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের এক যৌথসভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় চলমান ছাত্র আন্দোলনে বিএনপি জামায়াত অনুপ্রবেশ ঘটিয়ে সরকারকে বেকায়দায় ফেলার ষড়যন্ত্র করছে অভিযোগ করেন নেতারা। বৈঠকে শিক্ষার্থীরা আবারও মাঠে নামলে নেতাকর্মীদের নজরদারি রাখার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। আন্দোলনে কারা ইন্ধন দিচ্ছে, অর্থের জোগান দিচ্ছে এবং আন্দোলনে কারো অনুপ্রবেশ ঘটছে কিনা তা মনিটরিং করতে বলা হয়েছে। ঢাকার রাস্তার প্রতিটি মোড়ে মোড়ে আওয়ামী লীগসহ সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের অবস্থান নিতে বলা হয়েছে। তবে কোনো ফাঁদে পা না দিয়ে সতর্কতার সাথে শুধু মনিটরিং করতে বলা হয়েছে। আ.লীগ নেতারা বলেন, সব আন্দোলনে ব্যর্থ হয়ে নিরাপদ সড়ক আন্দোলনে ভর করেছে বিএনপি। আন্দোলনে অনুপ্রবেশ ঘটিয়ে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে চায়। এসব অপচেষ্টা রোধে সরকারকে কার্যকর ভূমিকা নেয়ার দাবি জানান তারা। আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক বিএম মোজাম্মেল হক এমপি বলেন, নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলনে আমাদের সমর্থন রয়েছে। কিন্তু আন্দোলনে সরকার ও প্রশাসনকে জড়িয়ে অশ্লীল শব্দের প্ল্যাকার্ড ও ফেস্টুন ব্যবহার করতে দেখা যায়। শিবির ও ছাত্রদলের কর্মীদের সম্পৃক্ততা দেখা গেছে। তারা কোমলমতি শিক্ষার্থীদের আন্দোলনকে ইস্যু হিসেবে ব্যবহার করে ফায়দা লোটার চেষ্টা করছে। সবাইকে এ ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে। যাতে কেউ পরিস্থিতি উত্তাল করতে না পারে। এ ব্যাপারে নেতাকর্মীদের সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে। বৈঠক শেষে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক, সড়ক পরিবহণ ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেন, ছাত্র আন্দোলনে বিএনপি ও তার সাম্প্রদায়িক দোসররা সরকার হঠানোর নিরাপদ সড়ক খুঁজছে। তারা ৯ বছরে নয় মিনিটও রাস্তায় বিক্ষোভ করতে পারেনি। সে ব্যর্থতার পর তারা কোটা আন্দোলনে ভর করতে গিয়ে ব্যর্থ হয়েছে। এখন তারা সওয়ার হয়েছে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের নিরাপদ সড়ক দাবির আন্দোলনে। তার সাইন অ্যান্ড সিম্পটম (নমুনা) আমরা গত পাঁচ দিন ধরে লক্ষ্য করছি। সেতুমন্ত্রী বলেন, আমরা এও লক্ষ্য করছি, এই কোমলমতি শিক্ষার্থীদের মিছিলে ঢুকে কীভাবে অশ্লীল, বিশ্রী, অশালীন স্লোগানের উসকানি দিচ্ছে একটি রাজনৈতিক মতলবি মহল। তারা এই শিশুদের সমাবেশে খাবার পানি সরবরাহ করছে এবং উসকানি দিচ্ছে আরও উত্তেজিত হওয়ার জন্য। কাদের বলেন, কিছু কিছু এলাকা থেকে এই কুচক্রীমহলদের বের করে দিয়েছে শিক্ষার্থীরা। এই মহলটি সন্ধ্যার পর বেশি তৎপর হয়। সন্ধ্যার পর এখানে অনেক ঘটনা ঘটেছে। তিনি বলেন, নেতাকর্মীদের ধৈর্য ও সহিষ্ণুতা প্রদর্শনের অনুরোধ করেছি। কোনো প্রকার উসকানির ফাঁদে না পড়ে সে ব্যাপারে নেতাকর্মীদের সতর্ক থাকতে বলেছি। শিশুদের যৌক্তিক আন্দোলন যেন কোনোভাবে অযৌক্তিক দিকে না যায়- সে জন্য সবাই সচেতন থাকবো, সতর্ক থাকবো। শুধু তারা লক্ষ্য রাখবে কারা কারা শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মধ্যে অনুপ্রবেশ করছে। অন্যদিকে, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেছেন, শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে সুবিধাবাদী বা স্বার্থান্বেষী মহলের সম্পৃক্ততা দেখা গেছে। আমরা আন্দোলনের বিভিন্ন ভিডিওতে দেখেছি শিবিরের নেতাদের, বিএনপির ছাত্রদলের নেতাদেরও দেখেছি। তাদের নিজেদের মধ্যে যেই কথোপকথন তাও আমরা শুনেছি। শুনে আমাদের কাছে মনে হয়েছে তারা এই কোমলমতি শিশুদের দিয়ে একধরনের অপরাধ সংঘটন করিয়ে দিতে পারে। কোমলমতি ছাত্ররা তাদের সহপাঠী হারানোর বেদনায় সিক্ত হয়ে সহানুভূতি জানাচ্ছে। কিন্তু এটা ভিন্ন দিকে টার্ন নিতে পারে বলে আমরা আশঙ্কা করছি।