মুজিবের বঙ্গবন্ধু হয়ে ওঠা

প্রকাশিতঃ 3:32 am | August 03, 2018 | ১৯

বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও ‘বাংলার যৌবন শক্তির প্রতীক’ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। জন্ম ১৯২০ সালের ১৭ মার্চ ফরিদপুর জেলার গোপালগঞ্জ মহকুমার (বর্তমানে গোপালগঞ্জ জেলা) টুঙ্গিপাড়া গ্রামে। গ্রামটি একদা মধুমতী নদীর তীরে থাকলেও পরবর্তীতে এ নদী বেশ খানিকটা দূরে সরে গেছে। বর্তমানে রয়েছে তারই একটি শাখা নদী, নাম বাইগার। এই বাইগার তীরবর্তী এক প্রাচীন বুনিয়াদি শেখ বংশে জন্ম মুজিবের।

এই বংশের আদিপুরুষ শেখ বোরহান উদ্দিন ছিলেন একজন ধার্মিক পুরুষ, তার অধস্তন এক পুরুষ হলেন শেখ আবদুল হামিদ। তারা ছিলেন তিন ভাই। অন্য দুই ভাই হলেন শেখ আবদুল মজিদ ও শেখ আবদুর রশিদ। শেখ আবদুর রশিদ নিজ গ্রামে একটি এমই স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন। ইংরেজ সরকার তাকে ‘খানসাহেব’ উপাধি দেন।

শেখ আবদুল হামিদের এক ছেলে শেখ লুৎফর রহমান ছিলেন সরকারি চাকুরে। তিনি চাচাত বোন অর্থাৎ শেখ আবদুল মজিদের ছোট মেয়ে সায়েরা খাতুনের সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। এই দম্পতির জ্যেষ্ঠ পুত্র হলেন শেখ মুজিবুর রহমান। ছয় ভাই-বোনের মধ্যে মুজিব ছিলেন জ্যেষ্ঠ, তার অপর ভাই শেখ আবু নাছের। টুঙ্গিপাড়ার সম্ভ্রান্ত শেখ পরিবারের এই ছয় ভাই-বোন ও তাদের সন্তান-সন্ততিরা বাংলাদেশের ইতিহাসে গৌরবময় এক অধ্যায়ের রচনাকারক। বিশেষ করে শেখ লুৎফর রহমানের পুত্র শেখ মুজিবুর রহমান হলেন স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশ রাষ্ট্রের স্থপতি। যিনি হাই স্কুলের ছাত্রাবস্থায় স্বদেশি আন্দোলনের নেতা-কর্মীদের সংস্পর্শে আসেন, স্বদেশি ভাবধারায় উদ্বুদ্ধ হন ও নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসুর অনুসারী হয়ে যান।

স্বাধীনতা সংগ্রামীদের সঙ্গে মেলামেশা ও সভা-সমাবেশে যোগদানের কারণে ভারতবর্ষে চলমান অসহযোগ আন্দোলনের গতি-প্রকৃতি ও ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের শোষণ-নিপীড়ন সম্পর্কে শৈশবেই মুজিব পুরোপুরি ওয়াকিবহাল ছিলেন। ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কুঠিয়ালদের লুণ্ঠন-অত্যাচারে জর্জরিত ছিল বাংলার জনগণ, শেখ পরিবারের লোকেরাও এ থেকে রেহাই পাননি। তাছাড়া মুসলমানদের প্রতি বঞ্চনা-নিপীড়ন তো চলে আসছিলই। ফলে পরিবারের লোকদের সঙ্গে বাল্যবয়সে মুজিবের মনে ইংরেজবিরোধী মনোভাব তৈরি হয়েই ছিল। নিজের আত্মজীবনীর শুরুতেই তিনি এই মনোভাবের কথা লিখেছেন।

১৯৩৮ সালে বাংলার দুই অবিসংবাদিত নেতা প্রধানমন্ত্রী শেরেবাংলা একে ফজলুল হক ও তৎকালীন শ্রমমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী গোপালগঞ্জে মথুরানাথ স্কুল পরিদর্শনে আসেন। এই দুই নেতার আগমন, পরিদর্শন ও সংবর্ধনা সংশ্লিষ্টতায় সে স্কুলের ছাত্র শেখ মুজিবের জীবনের মোড় ঘুরে যায়। মুজিবের সাংগঠনিক দক্ষতা ও তৎপরতা দেখে মুগ্ধ হন সোহরাওয়ার্দী। পরিচিতি জেনে শেখ মুজিবকে কলকাতায় আসতে বলেন ও ফিরে গিয়ে চিঠি দেন তিনি। শেখ মুজিবও উত্তর পাঠান। এভাবেই সোহরাওয়ার্দীর সঙ্গে একটা সহজ সম্পর্ক তৈরি হয়ে যায় শেখ মুজিবের, তৈরি হয় গুরু-শিষ্য সম্পর্ক। অচিরেই শেখ মুজিব কলকাতা চলে যান, ভর্তি হন ইসলামিয়া কলেজে। লেখাপড়ার পাশাপাশি রাজনীতিতে এসে সোহরাওয়ার্দীর অনুগত ও বিশ্বস্ত একজন সহচর হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন। এরই মধ্যে বাংলার মুসলিম লীগ রাজনীতিতে তার আবির্ভাব ঘটে। কখনো ছাত্র রাজনীতিতে, কখনো দুর্ভিক্ষপীড়িত মানুষের সাহায্যার্থে, কখনো সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় হতাহতদের শুশ্রƒষায়, কখনো বা ছাত্রদের দাবি পূরণে অগ্রণী ভূমিকায়। সংগঠনের কাজে গোপালগঞ্জ, মাদারীপুর, ফরিদপুর, যশোর, খুলনা ও বরিশাল পর্যন্ত ছুটে বেড়ান প্রধানমন্ত্রী সোহরাওয়ার্দীর নির্দেশে। এই তরুণ নেতা কলকাতা শহর, শহরতলি এমনকি পশ্চিম বাংলার প্রত্যন্ত অঞ্চলে দুর্ভিক্ষ ও দাঙ্গায় দুর্দশাগ্রস্তদের কল্যাণে দিন-রাত কাজ করেন।

সাতচল্লিশে দেশভাগের প্রাক্কালে সিলেটে যে গণভোট হয়, সেখানে নেতার নির্দেশ মতো দলবল নিয়ে কাজ করেন মুজিব। সে দলের একজন সদস্য ও ইসলামিয়া কলেজের সহপাঠী ছিলেন চট্টগ্রামের হাটহাজারীর ফরহাদাবাদ নিবাসী মোহাম্মদ মজহারুল কুদ্দুস। পরিণত বয়সে তিনি এক স্মৃতিচারণমূলক লেখায় মুজিবের নেতৃত্ব, পরিশ্রম, সাংগঠনিক দক্ষতা, মানবিকতা ও ভবিষ্যতে বাঙালি জাতির নেতৃত্বের আসনে বসার যোগ্যতা ও গুণাবলি যে কলকাতা জীবনে ফুটে উঠেছিল তারই চমৎকার বর্ণনা দিয়েছেন। সাতচল্লিশের দেশভাগের সময় ধারণা করা হয়েছিল যে, সমগ্র বাংলা ও আসাম নিয়ে এক রাষ্ট্র হবে এবং কলকাতা হবে রাজধানী। বাস্তবে তা হয়নি, দিল্লিতে বসে বাংলাকে বিভক্ত করা হয়। সোহরাওয়ার্দী-আবুল হাশিম, শরৎবসু ও কিরণ শঙ্কর রায় অনেক চেষ্টা করলেন। বাংলা কংগ্রেস ও মুসলিম লীগ নেতারা একটা ফর্মুলা বের করলেন, বসলেন কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে। কিন্তু হতাশ হতে হলো। ফর্মুলায় বলা হয়েছিল ‘বাংলাদেশ একটা স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র হবে। জনসাধারণের ভোটে একটা গণপরিষদ হবে। সেই গণপরিষদ ঠিক করবে বাংলাদেশ হিন্দুস্থান না পাকিস্তানে যোগদান করবে, নাকি স্বাধীন থাকবে।’ কিন্তু কংগ্রেসের গোঁয়ার্তুমির কারণে সব বিফলে গেল, বাংলা ভেঙ্গে টুকরো হলো। এই হতাশার কথা মুজিব লিখেছেন তার আত্মজীবনীতে। তিনি ভুলতে পারেননি। তার মনে জাগরূক ছিল ‘স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ’-এর কথা। বস্তুত সেই কলকাতা জীবন থেকে স্বাধীন-সার্বভৌম এক বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখে আসছিলেন মুজিব এবং সেই স্বপ্নের বাস্তবায়নের লক্ষ্যে কাজ শুরু করেন। ভারত ভাগ হলো, বাংলা ভাগ হলো। কলকাতা ছাড়তে হলো মুজিবকে, সোহরাওয়ার্দীকেও। ঢাকায় এলেন, নতুন দেশ গড়ার সংগ্রাম শুরু হলো। মুজিব জড়িয়ে পড়েন বাঙালির নিজস্ব স্বকীয়তা রক্ষা, সংস্কৃতি ও স্বাধিকার আন্দোলনে। মুসলিম লীগের হয়ে আন্দোলন সংগ্রাম করলেন, এত ত্যাগ স্বীকার করলেনÑ বছর না পার হতেই সেই মুসলিম লীগ সরকারের বিরুদ্ধেই রাস্তায় নামতে হলো। বাঙালিকে রাজপথে রক্ত ঝরাতে হলো। মুজিব সে আন্দোলনে শামিল হলেন, জেলে গেলেন। সে এক নিদারুণ বঞ্চনা, উপেক্ষা ও প্রতিবাদ-বিক্ষোভের ইতিহাস, নিপীড়ন, দমন ও রক্তাক্ত আন্দোলনের ইতিহাস। জেল, নির্যাতনের মধ্য দিয়ে মুজিব সবাইকে ছাড়িয়ে যান। উঠে এলেন শীর্ষে। এক নম্বরে সোহরাওয়ার্দী মারা গেলেন, ভাসানী অন্য দল করে পৃথক হলেন। এতদিন মুজিব ছিলেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক, ১৯৬৬ সালে এসে হলেন সভাপতি।

পাকিস্তানি স্বৈরশাসকগোষ্ঠী নিশ্চুপ বসে থাকেনি। একের পর এক ষড়যন্ত্র চলতে থাকে। বাঙালিরা ততদিনে বুঝে নিয়েছে পশ্চিম পাকিস্তানি কায়েমি স্বার্থবাদীগোষ্ঠী কোনো দিন বাঙালির স্বার্থ মেনে নেবে না, বাঙালিকে উপযুক্ত মর্যাদা দেবে না। মুজিব ১৯৬৬ সালের লাহোরে এক সম্মেলনে তার ৬ দফা দাবি পেশ করেন। কিন্তু সেই দাবি প্রত্যাখ্যাত হয়। উপরন্তু বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখানো হয়। বলা হয় মুজিবের ৬ দফা বিচ্ছিন্নতার দাবি, বৃহত্তর বাংলার দাবি ও রাষ্ট্রবিরোধী দাবি। ব্যাপক দমন-নিপীড়ন শুরু হয়। ১৯৬৬ সালের ৮ মে শেখ মুজিবকে দেশরক্ষা আইনে আটক করা হয়, ১৯৬৭ সালের ১৮ জানুয়ারি তিনি মুক্তি পান। তবে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় প্রধান এজাহারভুক্ত হিসেবে পুনরায় গ্রেফতার করে ক্যান্টনমেন্টে সামরিক হেফাজতে নেওয়া হয়। ১৯৬৮ সালের ফৌজদারি আইন সংশোধনী (বিশেষ ট্রাইব্যুনাল) অর্ডিন্যান্সের ৪ ধারা অনুযায়ী ১৯৬৮ সালের ২১ এপ্রিলের বিজ্ঞপ্তি নং এম আর ও ৫৯ (আর) ৬৮ বলে বিশেষ ট্রাইব্যুনালে রাষ্ট্র বনাম শেখ মুজিবুর রহমান ও অন্যান্যদের মামলা শুরু হয়। ১৯৬৮ সালের জুন মাসের তৃতীয় সপ্তাহে এই মামলার শুনানি শুরু হয় এবং ১৯৬৯ সালের ২৭ জানুয়ারি শুনানি শেষ হয় (দৈনিক পাকিস্তান ৫ম বর্ষ বিশেষ সংখ্যা, শনিবার ২২ ফেব্রুয়ারি, ১৯৬৯ এবং পরদিন ২৩ ফেব্রুয়ারি সংখ্যায় প্রকাশিত রিপোর্ট)। ২২ ফেব্রুয়ারি দৈনিক পাকিস্তান পত্রিকায় প্রকাশিত বিশেষ সংখ্যায় আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় শেখ মুজিবুর রহমানসহ ৩৫ জন অভিযুক্তের একটি তালিকা প্রকাশ করা হয়। শেখ মুজিবকে গ্রেফতারের পরবর্তী দুই দিনে আওয়ামী লীগের সাড়ে তিন হাজার নেতা-কর্মী গ্রেফতার হন।

স্মর্তব্য যে, লাহোরে মুজিবের ঐতিহাসিক ৬ দফা কর্মসূচি উত্থাপিত হয় ১৯৬৬ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি বিরোধী দলসমূহের জাতীয় সম্মেলনে। এ নিয়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়। বলা হয়, সাধারণ সম্পাদক হিসেবে তিনি দলীয় ফোরামে এই নিয়ে আলোচনা করেননি। ইত্তেফাক সম্পাদক তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া প্রকাশ্যে ৬ দফা সমর্থন করেন ও পত্রিকায় নিয়মিত সংবাদ প্রকাশ করেন। তিনি ইত্তেফাক পত্রিকায় নিজের লেখা উপসম্পাদকীয় কলামে ৬ দফার পক্ষে লিখে জনমত গঠনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। রাজনৈতিক সংগঠনের মধ্যে চট্টগ্রাম আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ প্রথম সংবাদপত্রে বিবৃতি দিয়ে ৬ দফার প্রতি সমর্থন ঘোষণা করেন, এই বিবৃতি প্রকাশিত হয় ১৪ ফেব্রুয়ারি। এর মধ্যে মুজিবের ধানম-ির বাসভবনে দলের ওয়ার্কিং কমিটির সভায় ও পরের মাসে (যথাক্রমে ফেব্রুয়ারি ও মার্চ মাসে) কাউন্সিল অধিবেশনের মাধ্যমে ৬ দফা অনুমোদিত হয়। এই অধিবেশনে শেখ মুজিবুর রহমান দলের সভাপতি ও তাজউদ্দীন আহমদ সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ঐতিহাসিক ৬ দফার পক্ষে প্রথম জনসভা অনুষ্ঠিত হয় চট্টগ্রামের লালদিঘি ময়দানে, ২৫ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত এই সভায় ভাষণ দেন দলের সভাপতি শেখ মুজিবুর রহমান ও অন্যান্য নেতৃবৃন্দ। সেদিন লালমলাটে ছাপানো ৬ দফার পুস্তিকাটি প্রথম বিলি করা হয়। চট্টগ্রামের চারণ কবি মোহাম্মদ শফি স্বকণ্ঠে ৬ দফার ওপর রচিত গান পরিবেশন করেন। একই ব্যক্তি পরদিন জেএম সেন হলে অনুষ্ঠিত জেলা আওয়ামী লীগের সম্মেলন ও কাউন্সিলে ৬ দফাভিত্তিক কবিতা আবৃত্তি করে উপস্থিত শেখ মুজিবসহ সবাইকে মুগ্ধ করেন। গান শুনে শেখ মুজিব তাকে ৫০ টাকা পুরস্কার দেন। চট্টগ্রাম থেকে নেতৃবৃন্দ মাইজদী ও বেগমগঞ্জের জনসভায় যোগ দেন। শেখ মুজিব তার সহযোগীদের নিয়ে দেশব্যাপী ঝটিকা সফর শুরু করেন। বাংলার জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণে ৬ দফার পক্ষে ব্যাপক জনমত তৈরি হয়। নেতৃবৃন্দ একটানা ৫০ দিনে ৩২টি জনসভা করেন ও ভাষণ দেন। প্রথম সভাটি হয় চট্টগ্রামে।

সরকার শেখ মুজিব ও হাজার হাজার নেতা-কর্মীকে গ্রেফতারের মাধ্যমে ৬ দফার পক্ষের গণজাগরণকে স্তব্ধ করে দিতে চেষ্টা করে। মুজিব ও আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে সংগঠিত পূর্ব বাংলার স্বায়ত্তশাসনের আন্দোলনকে চিরতরে দমনের উদ্দেশ্যে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় অভিযুক্ত করে, দীর্ঘ ৭ মাস ধরে চলে এই মামলার শুনানি ও জেরার কাজ।

এ সময় চট্টগ্রাম আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ একটি বিশেষ উদ্যোগ নেয়। মামলার ব্যয় নির্বাহের জন্য ‘মুজিব ফান্ড’ গঠন করে ও এমএ আজিজকে সভাপতি করে ১৫ সদস্যবিশিষ্ট কমিটি গঠন করে। এই ফান্ডে অর্থ সংগ্রহের জন্য ১ টাকা মূল্যমানের নোট ছাপানো হয়। রসিদে চিত্র অংকন করে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের অর্থনৈতিক বৈষম্যের চিত্র তুলে ধরা হয়। পশ্চিম পাকিস্তানকে ধনী বোঝানোর জন্য কলকারখানার ছবি এবং পূর্ব পাকিস্তানকে অনুন্নত ও দরিদ্র দেখানোর জন্য গ্রামীণ জনপদ ও ডাস্টবিনের ছবি আঁকা হয়। পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের চিত্রের মাঝখানে শেখ মুজিবুর রহমানের ছবি এঁকে দেওয়া হয়। এই অংকনের কাজটি করেন চিত্রশিল্পী সবিহ উল আলম। চট্টগ্রামে এই ফান্ড সংগ্রহের মাধ্যমে প্রায় ২০ হাজার টাকা ঢাকায় পাঠিয়ে দেওয়া হয়।

৬ দফাকে কেন্দ্র করে গ্রেফতার ও জুলুম-নিপীড়নের প্রতিবাদে দেশব্যাপী তুমুল আন্দোলন শুরু হয়। এরই মধ্যে চলছিল বিশেষ ট্রাইব্যুনালে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার বিচারের কার্যক্রম। দেশব্যাপী বিরাজ করছিল চরম উত্তেজনা। এমন সময় ১৫ ফেব্রুয়ারি (১৯৬৯) শনিবার বিশেষ ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার অন্যতম অভিযুক্ত সার্জেন্ট জহুরুল হককে ঢাকা সেনানিবাসে বন্দি অবস্থায় হত্যা করা হয়, আহত হন অপর অভিযুক্ত সার্জেন্ট ফজলুল হক। এই ঘটনার প্রতিবাদে ১৭ ফেব্রুয়ারি সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের আহ্বানে ঢাকা শহরের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্র ধর্মঘট পালিত হয়, সারা দেশে প্রতিবাদ বিক্ষোভ হয়। হরতাল, ধর্মঘট ও বিক্ষোভ মিছিলে সমগ্র দেশ অচল হয়ে পড়ে। রাজশাহীতেও বিক্ষোভ হয়। স্থানীয় প্রশাসন ১৪৪ ধারা জারি করে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে বিক্ষোভ প্রদর্শন করে। পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে বহু ছাত্র আহত হয়। ১৮ ফেব্রুয়ারি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও প্রক্টরের দায়িত্বপ্রাপ্ত ড. শামসুজ্জোহা সেনাবাহিনীর গুলিতে নিহত হন।

এই দুটি ঘটনার প্রতিক্রিয়া হয় দু’রকমের। একটি তাৎক্ষণিক ও অপরটি সুদূরপ্রসারী। খবর প্রচারের সঙ্গে সঙ্গে তাৎক্ষণিকভাবে সমগ্র দেশে বিদ্রোহের আগুন জ্বলে ওঠে, গণঅভ্যুত্থান ঘটে যায় দেশে। এরই মধ্যে ১৬ ফেব্রুয়ারি প্রেসিডেন্ট আইউব খান এক ঘোষণায় ১৯৬৫ সালের ৬ সেপ্টেম্বর জারিকৃত জরুরি অবস্থা প্রত্যাহার করেন, ১৭ ফেব্রুয়ারি থেকে এই ঘোষণা কার্যকর হয়। ১৯৬৯ সালের জানুয়ারি মাসে গঠিত ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ ১১ দফা ঘোষণা দেয়। ছাত্র-জনতার এই আন্দোলনে দিশেহারা হয় সরকার। অবশেষে ২২ ফেব্রুয়ারি, শনিবার সরকার আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহারপূর্বক ৩৩ সঙ্গীসহ প্রধান অভিযুক্ত শেখ মুজিবকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়। বন্দিদশা থেকে বেরিয়ে আসেন মুজিব বাঙালি জাতির মুক্তির দিশারী হিসেবে, আর ৬ দফা হয়ে ওঠে বাঙালির মুক্তির সনদ।

শেখ মুজিবুর রহমানের মুক্তির খবরে সারাদেশের মানুষ আনন্দে আত্মহারা হয়। চট্টগ্রামের পাড়া-মহল্লায় রাজনৈতিক কর্মী থেকে সাধারণ মানুষ বিজয় মিছিল বের করেন ও মিষ্টি বিতরণ করেন। শেখ মুজিবের ফটো শত শত কপি বিক্রি হয়। দৈনিক ইত্তেফাক সংবাদ ছাপে যে, একটি বড় সাইজের ছবি ৪০ টাকা পর্যন্ত বিক্রয় হয়। শহরে পটকাবাজি চলে এবং সন্ধ্যার পর লালদিঘি ময়দানে কবিগানের আসর বসে। কবিগানের বিষয়বস্তু ছিল মুজিব বনাম আইউব। ঢাকা শহরে হাজার হাজার মানুষ মুজিবকে নিয়ে শোভাযাত্রা সহকারে শহিদ মিনারে যায়, স্লোগানে স্লোগানে চারদিক মুখরিত করে তোলে।

পরদিন ২৩ ফেব্রুয়ারি, রোববার ছাত্রসংগ্রাম পরিষদের উদ্যোগে ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে স্মরণকালের বৃহত্তম গণসংবর্ধনা অনুষ্ঠিত হয়। সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক তোফায়েল আহমদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় দশ লক্ষাধিক লোক সমবেত হয় বলে দৈনিক ইত্তেফাক রিপোর্টে উল্লেখ করে। অনুষ্ঠানে তোফায়েল আহমদ পূর্ববাংলার নির্যাতিত জননায়ক শেখ মুজিবুর রহমানকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করেন। দৈনিক ইত্তেফাক পরদিন প্রথম পাতায় নিউজ ছাপে, শিরোনাম করে ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব’। রিপোর্টে বলা হয়Ñ“তোফায়েল আহমদ তার বক্তৃতায় বলেনÑআমরা বক্তৃতা বিবৃতিতে শেখ মুজিবুর রহমানকে নানা বিশেষণে বিশেষিত করার প্রয়াস পাই। কিন্তু তাঁর রাজনৈতিক জীবন বিশ্লেষণ করিলে যে সত্যটি সবচাইতে ভাস্বর হইয়া উঠে তা হইতেছে, তিনি মানবদরদী বিশেষ করিয়া বাংলা ও বাঙালি দরদী, প্রকৃত বন্ধু। তাই আজকের এই ঐতিহাসিক জনসমুদ্রের পক্ষ হইতে আমরা তাঁকে বঙ্গবন্ধু উপাধিতে ভূষিত করিতে চাই।”

বস্তুত গোপালগঞ্জ মথুরানাথ মিশন স্কুলের ছাত্রাবস্থায় সাধারণ মানুষের সঙ্গে একটা সহজ-মধুরতম সম্পর্ক তৈরি হয়। কলকাতায় ইসলামিয়া কলেজে ভর্তি হয়ে এবং সোহরাওয়ার্দীর ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্যে এসে বাংলার সব ছাত্র-জনতার সঙ্গে সে সম্পর্ক আরো নিবিড়তর হয়। শেখ মুজিব সর্বসাধারণ্যে ‘মুজিব ভাই’ হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। পরবর্তীকালে আটচল্লিশ ও বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনকে কেন্দ্র করে তার জনপ্রিয়তা অনেক বৃদ্ধি পায়। যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনের সময় মুজিবের ভূমিকা ছিল বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। পরবর্তীকালে মন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের অন্যতম শীর্ষনেতা হন মুজিব। দেশ ও জাতির এক ক্রান্তিকালে বিশেষ করে ৬ দফা আন্দোলনকে কেন্দ্র করে এবং আরো সুনির্দিষ্ট করে বলতে গেলে ৬ দফা আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে ও পাকিস্তানি সামরিক জান্তার কারাগারে বন্দি থাকাকালে মুজিবের জনপ্রিয়তা আকাশ ছুঁয়ে যায়। দেশব্যাপী সফরের মাধ্যমে ৬ দফার ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ বাংলার মানুষ সানন্দে গ্রহণ করে ও তাকে কেন্দ্র করে বাংলার নিপীড়িত মেহনতি মানুষ আশাবাদী হয়ে ওঠে। বস্তুত বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনার বিকাশ ঘটে তাকে কেন্দ্র করে। এবং সেটি মূলত শুরু হয় ষাটের দশকের শুরুতে। তিনি ছিলেন এই চেতনার মূল প্রেরণা-শক্তি এবং তাকে উপলক্ষ করে বঞ্চিত উপেক্ষিত বাঙালি একটা স্বাধীন রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখতে শুরু করে। এই আকাক্সক্ষা বাংলার সংগ্রামী ছাত্রসমাজের মাঝে বিস্তার লাভ করেছিল খুব দ্রুতই। সেই প্রেক্ষাপটে ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দানে প্রদত্ত লাখো মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতি ও সংবর্ধনা এবং বঙ্গবন্ধু উপাধি প্রাপ্তি বিশেষ তাৎপর্য বহন করে।

শেখ মুজিব এভাবেই ধীরে ধীরে হয়ে উঠেছিলেন বাঙালি জাতিসত্তার প্রতীক ও বাঙালির অধিকার আদায়ের সংগ্রাম-সময়ের মহানায়ক। সবার পরিচিত ও প্রিয় মুজিব ভাই হয়ে গেলেন বঙ্গবন্ধু। তবে এই উপাধি পাওয়ার পেছনে একটি ইতিহাস আছে। সে ইতিহাস কেউ কেউ জানলেও অনেকেই জানেন না। অথচ সবারই তা জানা দরকার।

৬ দফা আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে কারাগারে বন্দি থাকাকালে সংগ্রামী ছাত্রসমাজ ও বিভিন্ন সংগঠনের নেতৃবৃন্দ তাদের বক্তৃতা-বিবৃতিতে শেখ মুজিবের নামের আগে অবিভক্ত বাংলায় জাতীয় নেতাদের নামের আগে জুড়ে দেওয়া বহুল পরিচিত উপাধির মতো কিছু একটা যোগ করতে চেয়েছিল। যেমন বঙ্গশার্দুল, সিংহশার্দুল ইত্যাদি। কিন্তু এসব উপাধি তাদের কাছে যুৎসই বলে মনে হচ্ছিল না। যথার্থ তাৎপর্য ও যথাযথ গুরুত্ববহ বলে মানতে পারছিলেন না তারা। যা রেসকোর্সের ময়দানে সভাপতির ভাষণে তোফায়েল আহমদ উল্লেখ করেছিলেন।

১৯৬৭ সালে ঢাকা কলেজে পড়তেন শেখ মুজিব তনয় শেখ কামালের সহপাঠী ও বন্ধু চট্টগ্রামের রেজাউল হক চৌধুরী মুশতাক। চট্টগ্রাম মুসলিম হাই স্কুল ছাত্রসংসদের নির্বাচিত সাধারণ সম্পাদক হিসেবে ছাত্র রাজনীতিতে যুক্ত ছিলেন তিনি। জননেতা এমএ আজিজের চিঠি নিয়ে ঢাকা কলেজের সহপাঠী শেখ কামালের সঙ্গে দেখা করেন ও পরিচিত হন। সেই পরিচিতি ঘনিষ্ঠতায় রূপ নেয়। ঢাকা কলেজের ছাত্রলীগের রাজনীতিকে জনপ্রিয় করতে সাংগঠনিক তৎপরতা বাড়াতে উদ্যোগী হন উভয়ে। শেখ কামালের পরামর্শে ও ইচ্ছায়, মুশতাক কলেজ শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। যে সময় ঢাকা কলেজ ছাত্র সংসদের নির্বাচনকে সামনে রেখে ও ছাত্রলীগের বিজয় লাভের দিকটাকে গুরুত্ব দিয়ে উভয়ে কাজ শুরু করেন। ৬ দফা আন্দোলনকে কেন্দ্র করে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ক্রমেই উত্তাল হয়ে উঠছিল। তৎকালীন ছাত্র আন্দোলন ও বিকাশমান বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলনকে ছাত্রলীগের সাংগঠনিক কার্যক্রমের সঙ্গে সম্পৃক্ত করার লক্ষ্যে রেজাউল হক মুশতাক বন্ধু ও সতীর্থ শেখ কামালকে একটি বুলেটিন প্রকাশের জন্য প্রস্তাব দেন। শেখ কামাল সঙ্গে সঙ্গে সম্মতি প্রকাশ করে বলেন, তুমি যা ভালো মনে করবে কর। আমি তোমার সঙ্গে আছি। মুশতাক বুলেটিনের নাম দেন ‘প্রতিধ্বনি’। শেখ কামাল এতেও তার সম্মতি জানান। সম্পাদনার দায়িত্ব দেন মো. আমিনুর রহমানকে। ঢাকা কলেজের বুলেটিন ‘প্রতিধ্বনি’ প্রথম সংখ্যা প্রকাশিত হয় ১৯৬৮ সালের নভেম্বর মাসে (কার্তিক, ১৩৭৫ বঙ্গাব্দ)। বুলেটিনে প্রকাশের জন্য মুশতাক ‘আজব দেশ’ শিরোনামে ও সারথী ছন্দনাম দিয়ে একটি ছোট নিবন্ধ রচনা করেন। পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগের ঢাকা কলেজের প্যাডে ৪ পৃষ্ঠার হাতে লেখা নিবন্ধ। প্রবন্ধের শেষাংশের লিখা হয়Ñ

“দু’অংশের পার্থক্য ও অমিলকে স্বীকার করে, দু’অংশের ভাষা, সংস্কৃতি ও ইতিহাসকে পাশাপাশি স্থান দিয়ে ও সর্বোপরি পূর্ব বাংলার নয়নমণি-মুক্তির দিশারী-বঙ্গবন্ধু-সিংহ শার্দুল জনাব শেখ মুজিবুর রহমান কর্তৃক প্রস্তাবিত ৬ দফা কর্মসূচির বাস্তবায়নের মাধ্যমে, আজব ও অভিনব পাকিস্তানের ঐক্য ও সংহতি টিকে থাকতে পারে নতুবা নয়।” আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় সামরিক আদালতে বিচারাধীন শেখ মুজিবুর রহমান যখন সর্বসাধারণের মাঝে ভীষণ জনপ্রিয়। মুজিব ভাই হিসেবে বাঙালির হৃদয় জুড়ে ছিলেন। দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ, নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু, শেরেবাংলা একে ফজলুল হক, দেশপ্রিয় যতীন্দ্র মোহন সেনগুপ্ত প্রমুখের মতো মুজিব ভাইয়ের নামে কিছু একটা বিশেষণ যুক্ত করা দরকারÑমূলত এই চিন্তাটি মাথায় রেখে তরুণ ছাত্রনেতা মুশতাক এই ছোট্ট নিবন্ধে ‘পূর্ব বাংলার নয়নমণি মুক্তির দিশারী-বঙ্গবন্ধু,-সিংহ শার্দুল’ শেখ মুজিবুর রহমান লিখেছেন। কিন্তু দেশের সার্বিক পরিস্থিতি এ রকম লেখা প্রকাশের পক্ষে মোটেও অনুকূল ছিল না। তাই প্রতিধ্বনির প্রথম সংখ্যায় এই লেখা প্রকাশিত হয়নি। মুশতাকের মতে, তৎকালীন শীর্ষস্থানীয় ছাত্রনেতা শেখ ফজলুল হক মনি, সিরাজুল আলম খান নিবন্ধটি বুুলেটিনে না ছাপানোর পরামর্শ দেন। তবে বুলেটিনের শেষ পাতার শীর্ষস্থানে ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রস্তাবিত পূর্ববাংলার মুক্তি সনদ ৬ দফা’ প্রকাশিত হয়। ৬ দফা সম্পর্কিত শিরোনামের শুরুতে ‘বঙ্গবন্ধু’ বিশেষণটি এই প্রথম ছাপার অক্ষরে প্রকাশিত হয়। এই বঙ্গবন্ধু বিশেষ অনেকের পছন্দ হয়েছিল, ছাত্রনেতা তোফায়েল আহমদ তাদের একজন। যে বিশেষণটি তিন মাস পর রেসকোর্স ময়দানে কারামুক্ত শেখ মুজিবুর রহমানকে লাখো মানুষের উপস্থিতিতে প্রদান করেন তিনি। বস্তুত উপাধিটি তরুণ রেজাউল হক মুশতাকের নিজস্ব সৃষ্টি। তিনি ছিলেন এর উদ্ভাবক।

পরবর্তীকালে, জনাব মুশতাক ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় দায়িত্বপূর্ণ পদে ছিলেন। ১৯৭০ সালে তিনি সংক্ষিপ্তাকারে ‘এই দেশেতে জন্ম আমার’ নামে বঙ্গবন্ধুর জীবনী রচনা ও প্রকাশ করেন। এর মুদ্রিত একটি কপি নিয়ে বঙ্গবন্ধুর বাসভবনে গিয়ে তার হাতে দেন। বঙ্গবন্ধু ছাপার অক্ষরে নিজের সংক্ষিপ্ত জীবনী দেখে খুব খুশি হন ও তরুণ মুশতাককে বুকে জড়িয়ে ধরে বলেন, ‘ছাত্রলীগের ছেলেরা এত সুন্দর প্রকাশনা করতে পারে আমার ধারণা ছিল না।’ এই বলে তিনি পকেট থেকে পাঁচশ’ টাকার একটি নোট বের করে মুশতাকের হাতে গুঁজে দেন। বলেন, ‘এই বইটি প্রকাশ করতে তোর তো অনেক টাকা খরচ হয়েছে-এটি রাখ।’

মুশতাকের মতে, এরপর থেকে ছাত্রলীগের বিভিন্ন প্রচারপত্রে ‘বঙ্গবন্ধু’ বিশেষণ ব্যবহার হতে থাকে। এবং রেসকোর্স ময়দানে আনুষ্ঠানিক ঘোষণার পর সংবাদপত্রের কল্যাণে খুব শীঘ্রই ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। বাংলাদেশের স্বাধীনতা পরবর্তীকালে বিভিন্ন গবেষণা গ্রন্থ ও বিশিষ্ট ব্যক্তির স্মৃতিচারণে ‘বঙ্গবন্ধু’ বিশেষণ যুক্ত হওয়ার বিষয়টি প্রকাশ পায়। এ বিষয়ে ১৯৮৭ সালের ৩১ জুলাই দৈনিক বাংলা পত্রিকায় ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধ’ শীর্ষক লেখায় ওবায়দুল কদের (বর্তমানে সড়ক ও সেতুমন্ত্রী) প্রথম ঢাকা কলেজ ছাত্রলীগের বুলেটিন ‘প্রতিধ্বনি’র জন্য রেজাউল হক মুশতাকের উদ্ভাবিত বঙ্গবন্ধু বিশেষ প্রয়োগের বিষয়ে লিখেন। তিনি লিখেছেন,‘তখন অবশ্য ছোট হেডিংয়ে অখ্যাত এক পত্রিকায় ব্যবহৃত ‘বঙ্গবন্ধু’ শব্দটি ঢাকার ছাত্রমহলের একাংশ ছাড়া অন্য কারো নজর কাড়েনি। হয়ত স্থান-কাল-পাত্রের বিবেচনায় সেসময় শেখ মুজিবুরের নামের সঙ্গে এমন একটা বিশেষণ প্রয়োগের ভাবনাটা তেমন গুরুত্ব পায়নি। ওটা গুরুত্ব পায় ঠিক তখন, যখন জাগ্রত বাঙালি জাতির জাগরণের সব স্রোতধারা এক মোহনায় একাকার, যখন গণমোহন মুজিব বিদ্রোহী বাংলার মুকুটহীন সম্রাট। বলা দরকার, মুজিবের জন্য যুৎসই খেতাব হিসেবে বঙ্গবন্ধু শব্দটি শেখ ফজলুল হক মনি, সিরাজুল আলম খান ও ’৬৯-এর তরুণ নেতৃত্বের সকলের পছন্দ হয়েছিল।’ এরপর মোরশেদ শফিউল হাসানের লেখা- স্বাধীনতার পটভূমি : ১৯৬০ দশক; ছাত্রনেতা শেখ মোহাম্মদ জাহিদ হোসেনের লেখাÑমুক্তিযুদ্ধে ছাত্রলীগ ও বাংলাদেশ লিবারেশন ফোর্স (বিএলএফ); মহিউদ্দিন আহমদেরÑ জাসদের উত্থান-পতন; অস্থির সময়ের রাজনীতি এবং বাংলাদেশ ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সংসদের সাধারণ সম্পাদকের কার্যবিবরণী (১৯৯২)তে ঢাকা কলেজ ছাত্রলীগের বুলেটিনে প্রকাশিত ‘বঙ্গবন্ধু’ বিশেষণ ও রেজাউল হক মুশতাকের ভূমিকার কথা আলোচনায় এসেছে।

বস্তুত বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে তৎকালীন অগ্নিসময়ে শেখ মুজিবুর রহমান ওরফে মুজিব ভাইয়ের উজ্জ্বল ভাবমূর্তি প্রতিষ্ঠায় ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধি বিরাট ভূমিকা রেখেছিল। ২৩ ফেব্রুয়ারি ১৯৬৯ তারিখ থেকে তিনি আপামর জনগণের কাছে হয়ে যান বঙ্গবন্ধু। বক্তৃতা-বিবৃতিতে, লেখালেখিতে, গানে-কবিতায়, প্রবন্ধে-সাহিত্যে, লোককবির লড়াইয়ে, রাজপথের স্লোগানে-সম্বোধনে ‘বঙ্গবন্ধু’ শেখ মুজিবের নামের সঙ্গে একাকার হয়ে যায়। যেমন ছিলেন একদা দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন-তেমনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব। শেখ মুজিব মানে বঙ্গবন্ধু আর বঙ্গবন্ধু মানেই হলেন শেখ মুজিব।