কোভিড-১৯: হাসপাতালে রোগীর চাপ কতটা কীভাবে কমেছে

প্রকাশিতঃ 3:31 am | April 29, 2021 | ১০২

করোনাভাইরাস সংক্রমণের ‘দ্বিতীয় ঢেউয়ের’ কঠিন সময়টা পেরিয়ে এসে দৈনিক শনাক্ত রোগী কমার পাশাপাশি হাসপাতালে রোগীর চাপ কিছুটা হলেও কমেছে।

ঢাকার সরকারি-বেসরকারি কোভিড ডেডিকেটেড হাসপাতালোর সাধারণ শয্যায় এক মাস আগে যেখানে আড়াই হাজার রোগী ভর্তি ছিল, বুধবার তা আড়াই হাজারের নিচে নেমে এসেছে। এর মধ্যে ১৫ এপ্রিল ৩৭৯৫ জন রোগীও ভর্তি ছিলেন এসব হাসপাতালে।

তবে হাসপাতালগুলোর আইসিইউতে বুধবারও ৪৩৩ জন রোগী ভর্তি ছিলেন, যেখানে ঠিক এক মাস আগে আইসিইউতে ভর্তি রোগীর সংখ্যা ছিল আড়াইশ জন। এপ্রিলের তৃতীয় সপ্তাহের শুরুতে এই সংখ্যা ৬২০ জনে উঠেছিল।    

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, গত ২৮ মার্চের তুলেনায় ২৮ এপ্রিল এসব হাসপাতালে ভর্তি রোগীর মোট সংখ্যা কিছুটা বেশি থাকলেও শয্যা সংখ্যা দ্রুত বাড়ানোর ফলে সঙ্কট অনেকটা কমে এসেছে। সেই সঙ্গে লকডাউনের বিধিনিষেধও হাসপাতালে চাপ কমাতে ভূমিকা রেখেছে বলে মনে করছেন স্বাস্থ্য খাতের বিশেষজ্ঞরা।   

তবে এখনও যে পরিস্থিতি, তাতে নিশ্চিন্ত হওয়ার কিছু নেই মন্তব্য করে আইইডিসিআরের উপদেষ্টা ডা. মুশতাক হোসেন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেছেন, সংক্রমণ যেন ‘শূন্যে’ নামিয়ে আনা যায়, সেদিকে মনোযোগ বাড়াতে হবে।

“মনে রাখতে হবে, করোনাভাইরাসের তৃতীয় ঢেউও আসতে পারে। সেই চিন্তা মাথায় রেখে সরকারি বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে আগেই সব ধরনের প্রস্তুতি নিয়ে রাখতে হবে।”

গত বছরের ৮ মার্চ দেশে করোনাভাইরাসে প্রথম রোগী শনাক্ত হওয়ার পর সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা সম্প্রসারণ করে মহামারী নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেছিল সরকার।

প্রথম ধাক্কা সামলে ওঠার পর রোগী কমে আসায় সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে কয়েকটি হাসপাতালে কোভিড চিকিৎসা বন্ধ করে দেওয়া হয়।

এ বছর ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি সময়ে পরীক্ষার বিপরীতে দৈনিক শনাক্ত রোগীর হার তিন শতাংশের নিচে নেমে এলেও এরপর সংক্রমণ দ্রুত হু হু করে বাড়তে থাক। এক মাসের মাথায় পরিস্থিতি বিপদজনক দিকে মোড় নিতে থাকে, হাসপাতালে বাড়তে থাকে রোগীর চাপ।

এপ্রিলের শুরুতে পরিস্থিতি এমন দাঁড়ায় যে, ঢাকায় রোগী ভর্তির জন্য হাসপাতালের দুয়ারে দুয়ারে ঘুরতে হয়েছে স্বজনদের। আইসিইউ না পেয়ে মৃত্যুর খবরও সে সময় এসেছে।  

সে সময় শয্যা খালি না থাকায় কোভিড-১৯ রোগীদের ফিরিয়ে দেওয়ার কথাও জানাতে হয়েছে নিরুপায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে।

ভারতে হাসপাতালে ঠাঁই নেই, ঘরেও চলছে বাঁচার লড়াই  

করোনাভাইরাস: এক সপ্তাহে রোগী কমেছে ২৫%  

২৫ মার্চ স্বাস্থ্য অধিদপ্তর আগের এক দিনে ৩৫৮৭ জন নতুন রোগী শনাক্তের তথ্য দিয়েছিল। সেদিন ঢাকার সরকারি-বেসরকারি কোভিড হাসপাতালগুলোতে সাধারণ শয্যার ৭৬ শতাংশ এবং আইসিইউ শয্যার ৮৪ শতাংশে রোগী ভর্তি ছিল। 

২৯ মার্চ দেশে প্রথমবারের মত পাঁচ হাজারের বেশি, ৫১৮১ জন নতুন রোগী শনাক্তের খবর আসে। সেদিন হাসপাতালগুলোতে সাধারণ শয্যার ৭৯ শতাংশ এবং আইসিইউ শয্যার ৮৪ শতাংশে রোগী ভর্তি ছিল।

পরের সপ্তাহে ৪ এপ্রিল প্রথমবারের মত দৈনিক শনাক্ত রোগী সাত হাজার ছাড়িয়ে যায় এবং ৭ এপ্রিল রেকর্ড ৭৬২৬ জন নতুন রোগী শনাক্তের খবর জানায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।

করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার পর অধিকাংশ ক্ষেত্রে হাসপাতালে যাওয়ার মত জটিলতাগুলো দেখা দেয় দ্বিতীয় সপ্তাহে। আর মৃত্যুর সংখ্যায় তার প্রভাব পড়ে তৃতীয় সপ্তাহে। 

৭ এপ্রিল ঢাকার কোভিড হাসপাতালগুলোতে সাধারণ শয্যার ৮৮ শতাংশ এবং আইসিইউ শয্যার ৯৩ শতাংশে রোগী ভর্তি ছিল। ১০ এপ্রিল এই হার ছিল যথাক্রমে ৮৯ ও ৯৬ শতাংশ।

পরের সপ্তাহে ১৪ এপ্রিল হাসপাতালগুলোতে সাধারণ শয্যার ৮৮ শতাংশ এবং আইসিইউ শয্যার ৯৮ শতাংশে রোগী ভর্তি ছিল। সেদিন ছিল সংক্রমণ রোধে সরকারের জারি করা কঠোর লকডাউনের বিধিনিষেধের প্রথম দিন।

এক সপ্তাহ পর ২১ এপ্রিল স্বাস্থ্য অধিদপ্তর আগের ২৪ ঘণ্টায় ৪২৮০ নতুন রোগী শনাক্তের খবর জানায়। সেদিন ঢাকার কোভিড হাসপাতালগুলোতে সাধারণ শয্যার ৬৪ শতাংশে এবং আইসিইউ শয্যার ৮৩ শতাংশে রোগী ভর্তি ছিল।

আর ২৮ এপ্রিল বুধবার সাধারণ শয্যার ৪৪ শতাংশে এবং আইসিইউ শয্যার ৫৭ শতাংশ ভর্তি ছিল রোগীতে।

কোভিড-১৯: আক্রান্ত বেশি যুবকরা, মৃত্যু বেশি বয়স্কদের

কোভিড-১৯: নমুনা পরীক্ষা বাড়ানোর তাগিদ বিশেষজ্ঞদের

করোনাভাইরাস: লকডাউনের সপ্তাহে রেকর্ড সংক্রমণ ও মৃত্যুর খবর  মহাখালীর ডিএনসিসি কোভিড-১৯ ডেডিকেটেড হাসাপাতালে ভর্তির অপেক্ষায় করোনাভাইরাস আক্রান্ত দুইজন। ছবি: মাহমুদ জামান অভি

মহাখালীর ডিএনসিসি কোভিড-১৯ ডেডিকেটেড হাসাপাতালে ভর্তির অপেক্ষায় করোনাভাইরাস আক্রান্ত দুইজন। ছবি: মাহমুদ জামান অভিসঙ্কটের সেই পর্যায় পেরিয়ে এসে হাসপাতাল সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মানুষের মধ্যে এখন স্বাস্থ্যবিধি মানার প্রবণতা বেড়েছে। পাশাপাশি লকডাউনের কারণেও হাসপাতালে রোগীর ভিড় কমছে।

ঢাকার ল্যাবএইড হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডা. এএম শামীম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে জানান, ফেব্রুয়ারি মাসে তার হাসপাতালে নমুনা পরীক্ষায় ৩ থেকে ৫ শতাংশের করোনাভাইরাস শনাক্ত হত। মার্চ মাসে নমুনা পরীক্ষার চাপ বাড়ার পাশপাশি শনাক্তের হার ৪০ শতাংশের কাছাকাছি পৌঁছায়।

মার্চের প্রথম সপ্তাহে এ হাসপাতালের কোভিড ইউনিটে ৮ জনের মতো রোগী থাকলেও এপ্রিলের দ্বিতীয় সপ্তাহে তা বেড়ে ১২৬ জনে দাঁড়ায়।

ডা. শামীম বলেন, গত সাত দিনে তার হাসপাতালে শনাক্তের হার কমে এসেছে। ভর্তি রোগীর সংখ্যাও কমেছে। ভর্তি রোগীর মৃত্যুর হার ১৭ শতাংশ থেকে কমে সাত-আট শতাংশ হয়েছে।

“এক সময় ১১-১২ দিন আমি মোবাইল ধরিনি পারত পক্ষে। বেড ম্যানেজ করে দেওয়ার জন্য এত ফোন আসছিল… । গত পাঁচ দিন সেরকম টেলিফোন আর পাইনি। তার মানে এই লকডাউন দিয়ে মনে হয় ভালোই হয়েছে।”

বেসরকারি স্কয়ার হাসপাতালের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ইউসুফ সিদ্দিকও একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা জানালেন।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, “১০ দিন আগে যে পরিস্থিতি ছিল, তার চেয়ে ২৫ শতাংশের মত লোড কমে গেছে। ১০দিন আগে আইসিইউ বলেন, আর সাধারণ বেড বলেন, একটাও দিতে পারতাম না। একটা পেশেন্ট বের হলে সঙ্গে সঙ্গে আরেকটা পেশেন্ট ঢুকত।

এর পেছরে লকডাউনের যে একটা প্রভাব আছে, সে কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, “লকডাউনের কারণে রোগীদের অনেকে হয়ত ঢাকায় আসতে পারছে না। মানুষের বাসায় চিকিৎসা নেওয়ার প্রবণতা বেড়েছে। আবার সংক্রমণের যে পিকটা উঠেছিল, সেটা কিছুটা ডাউনের দিকে আছে।”

বেসরকারি হাসপাতালে চাপ যতটা কমেছে, সরকারি হাসপাতালে ততটা নয়, কারণ সাধারণ মানুষ সবার আগে সরকারি হাসপাতালেই যায়।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল নাজমুল হক বুধবার বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, তার হাসপাতালেও সাধারণ শয্যায় রোগীর চাপ কিছুটা কমেছে। তবে আইসিইউ এখনও রোগী ভর্তি।

লকডাউনের বিধিনিষেধের পাশাপাশি হাসপাতালগুলোতে সংখ্যা অল্প সময়ের মধ্যে বাড়ানোর ব্যবস্থা করায় হঠাৎ বিপুল রোগীর চাপ সামলানো সম্ভব হয়েছে চিকিৎসকদের জন্য।

ঢাকার সরকারি বেসরকারি কোভিড হাসপাতালগুলোতে ২৫ মার্চ যেখানে ৩ হাজার ৩২৯টি সাধারণ শয্যায় রোগী ভর্তির ব্যবস্থা ছিল, ২৮ এপ্রিল তা বেড়ে ৫ হাজার ৫৩৯টি হয়েছে। এই সময়ে আইসিইউ শয্যার সংখ্যা ২৯১টি থেকে বেড়ে ৭৫৯টি হয়েছে। 

অর্থাৎ, এক মাসে এসব হাসপাতালে সাধারণ শয্যা সব মিলিয়ে বেড়েছে ৬৬ শতাংশের মত। আর আইসিইউ শয্যা বেড়েছে ১৬০ শতাংশ।

কেবল হাসপাতাল শয্যা নয়, কোভিড চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় অন্যান্য ক্ষেত্রেও সক্ষমতা বৃদ্ধির ওপর জোর দিয়ে ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, “ভারতে যে পরিস্থিতি, বাংলাদেশেও তেমন হতে পারে- এটা সিরিয়াসলি বিশ্বাস করে প্রস্তুতি নিতে হবে। অক্সিজেনের সঙ্কট যেন না হয়, সেজন্য আমরা অক্সিজেন তৈরি করতে পারি। সবচেয়ে বড় কাজ, সংক্রমণ প্রতিরোধে জনস্বাস্থ্যের কাজগুলোয় যেন আমরা কোনো অবহেলা না করি।”

আর হাসপাতালে রোগীর চাপ কমে আসার বিষয়টিকে ‘আশার আলো’ হিসেবে বর্ণনা করে সবাইকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার আহ্বান জানিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক।

বুধবার এক অনুষ্ঠানে বলেন, “স্বাস্থ্যবিধি না মানলে আবার সংক্রমণ বাড়তে সময় লাগবে না। ভারতের কী অবস্থা হয়েছে আপনারা দেখতে পাচ্ছেন। আমরা চাই না সে ধরনের পরিবেশ তৈরি হোক।”