ঢাকার রাস্তা ছোটদের নিয়ন্ত্রণে

প্রকাশিতঃ 3:04 am | August 03, 2018 |

রাজধানীর বিমানবন্দর সড়কে বাসচাপায় শহীদ রমিজ উদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের দুই শিক্ষার্থীকে হত্যার জের ধরে গতকাল বৃহস্পতিবার পঞ্চম দিনের মতো সড়কে বিক্ষোভ-অবরোধ করেছে শিক্ষার্থীরা। উত্তেজনা প্রশমনের লক্ষ্যে গতকাল দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখা হলেও রাজধানীতে এর ফল হয়েছে উল্টো। গতকাল আরো বেশিসংখ্যক শিক্ষার্থী অংশ নেয় বিক্ষোভে। স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা সকাল থেকেই কয়েকটি পয়েন্টে অবস্থান নিয়ে যানবাহনের লাইসেন্স যাচাই শুরু করে। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পুরো রাজধানীতে ছড়িয়ে পড়ে এমন কার্যক্রম। শহরের শতাধিক স্কুল ও কলেজের শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি মেডিক্যাল কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও সড়কে নেমে আসে। শহরের প্রধান সড়কগুলোর পাশাপাশি বিভিন্ন সংযোগ সড়ক, এমনকি পাড়া-মহল্লার অলিগলিতেও শিক্ষার্থীদের ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার অনিয়ম যাচাই করতে দেখা যায়। শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে কার্যত অচল হয়ে পড়ে ঢাকা শহর।

দিনভর চালকদের লাইসেন্স যাচাই ছাড়াও সারিবদ্ধভাবে যান চলাচল নিয়ন্ত্রণ এবং বিভিন্ন অনিয়মের কারণে চালকদের ভর্ৎসনা করে গাড়ি আটকে ফেলে শিক্ষার্থীরা। তাদের তল্লাশি থেকে রেহাই পায়নি পুলিশসহ প্রশাসনের লোকজনও। পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের গাড়িও আটকে দেয় শিক্ষার্থীরা। বৃষ্টি উপেক্ষা করে গতকাল বিকেল ৪টা পর্যন্ত বেশির ভাগ সড়ক দখলে রাখে তারা। রাজধানীর প্রগতি সরণিসহ কয়েকটি রাস্তায় তারা সন্ধ্যা পর্যন্ত ছিল।

সরকার শিক্ষার্থীদের সব দাবি মেনে নিয়েছে, এর পরও আন্দোলন কেন—জানতে চাইলে শিক্ষার্থীরা বলে, তাদের দাবিগুলো বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত তারা আন্দোলন চালিয়ে যাবে। সরকারের আশ্বাস তারা বিশ্বাস করতে পারছে না বলেও জানায়।

গতকাল শিক্ষার্থীরা শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি পালন করলেও কয়েকটি এলাকায় পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ হয়েছে। মিরপুর-১৪ নম্বরে শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশ লাঠিপেটা করে। এতে কয়েকজন শিক্ষার্থী আহত হয় বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। সেখানে ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা পুলিশের গাড়ি ভাঙচুর করে। সায়েন্স ল্যাবরেটরি এলাকায় কাগজপত্র দেখা নিয়ে বাগিবতণ্ডার জের ধরে ট্রাফিক পুলিশের এক সার্জেন্টকে পিটিয়ে আহত করে কিছু তরুণ। তারা দাবি করে, ওই সার্জেন্ট আগে ছাত্রদের মারধর করেন। এ কারণেই হামলার ঘটনা ঘটে। এ ছাড়া শান্তিনগরে কয়েকটি গাড়িতে হামলা চালায় বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা। বাংলামোটর, মগবাজার, শান্তিনগর ও ধানমণ্ডিতে শিক্ষার্থীরা পুলিশের ওপর চড়াও হয়।

অন্যদিকে পুলিশের কর্মকর্তারা বলছেন, শিশু-কিশোরদের আন্দোলনকে মানবিক দৃষ্টিতে দেখা হচ্ছে। এ কারণে তাদের ওপর চড়াও না হওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে মাঠপর্যায়ের সদস্যদের। তবে পুলিশের গাড়িসহ যানমালের ক্ষতি হলে পুলিশ ব্যবস্থা নেবে। পুলিশ কর্মকর্তারা দাবি করেন, শিশুদের ওপর পুলিশি নির্যাতনের ভুয়া ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পরিস্থিতি অশান্ত করার চেষ্টা করছে একটি মহল। এসব অপপ্রচারে কান না দিয়ে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন বন্ধ করার অনুরোধ জানান তাঁরা।

গত রবিবার দুপুরে জাবালে নূর পরিবহনের বাসের চাপায় শহীদ রমিজ উদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্র আবদুল করিম রাজীব ও একাদশ শ্রেণির ছাত্রী দিয়া খানম মীমকে হত্যার দিন থেকেই প্রতিবাদে মুখর হয়ে ওঠে শিক্ষার্থীরা। শহীদ রমিজ উদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজ আজ শুক্রবার পর্যন্ত বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। সেখানকার শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভে বাধাও দিয়েছে কর্তৃপক্ষ। তবে থামানো যায়নি ছাত্র আন্দোলন।

৯ দফা দাবিতে গতকাল যশোর শহরের দড়াটানায় সড়ক অবরোধ করে শিক্ষার্থীরা। 

অনেক নতুন সড়কে শিক্ষার্থীরা : গতকাল সকালে কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্ররা গুলশানসহ আশপাশের এলাকা অবরুদ্ধ করে ফেলে। বনানী বিদ্যানিকেতন ও সাউথইস্ট ইউনিভার্সিটির কয়েকজন শিক্ষার্থী জানান, তাঁরাও নামলেন, কারণ এটা সবার দাবি। তাঁরা দেখাতে চান শিক্ষার্থীরা বড়দের চেয়েও সচেতন।

সকাল ১১টায় বনানীর বিমানবন্দর সড়ক থেকে মিছিল নিয়ে মহাখালী ও গুলশান-২ নম্বরে জড়ো হচ্ছিল শিক্ষার্থীরা। ওই সময় তারা রাস্তার প্রতিটি গাড়ির লাইসেন্স তল্লাশি করে। তবে সড়ক বন্ধ করেনি। এ কারণে পুরো রাস্তায় তীব্র যানজট লেগে যায়।

দুপুরে শান্তিনগর এলাকায় বিক্ষোভ করে আশপাশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা। তারা সেখানে কয়েকটি গাড়ি ভাঙচুর করে। এরপর কাকরাইল, শান্তিনগর, মালিবাগ, মগবাজার ও বেইলি রোড এলাকায় রাস্তায় লাইসেন্স তল্লাশি করা হয়। মিন্টো রোডের মোড়ে দুপুরে তল্লাশি শুরু করে হলি ফ্যামিলি মেডিক্যাল কলেজ, সিরাজুল ইসলাম, আদ্বদীন ও কমিউনিটি মেডিক্যাল কলেজের শিক্ষার্থীরা। মিন্টো রোডের মোড়ে দুপুর দেড়টার দিকে তারা পুলিশের একটি পিকআপ ভ্যান (ইঞ্জিন নং-৬৬৫২৬৬) চালকের লাইসেন্স দেখতে চায়। তবে চালক লাইসেন্স দেখাতে পারেনি। এ কারণে পাশে দাঁড়িয়ে থাকা পুলিশ সার্জেন্টকে মামলা করতে বলে শিক্ষার্থীরা। তখন সার্জেন্ট ৪০০ টাকা জরিমানা করেন। মেডিক্যাল শিক্ষার্থী রাশেদুল ও জান্নাত বলেন, সড়কে কী নৈরাজ্য চলছে তা বোঝাই যাচ্ছে। এগুলো বন্ধ হোক এটাই তাঁরা চান। তাহলে দুর্ঘটনা কমবে।

মোহম্মদপুরে কলেজগেট ও আসাদগেটে সকাল ১০টা থেকে বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত অবস্থান কর্মসূচি পালন করে শিক্ষার্থীরা। সকাল ১১টায় গিয়ে দেখা যায়, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ও শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজের শিক্ষার্থীরা কলেজগেটে সড়ক অবরোধ করে রেখেছে। ঢাকা রেসিডেনসিয়াল মডেল কলেজ, মোহাম্মদপুর মডেল স্কুল ও কলেজ, মোহাম্মদপুর কেন্দ্রীয় কলেজ, সেন্ট জোসেফ স্কুল অ্যান্ড কলেজ, মোহাম্মদপুর প্রিপারেটরি স্কুল ও কলেজ, ধানমণ্ডি গভ. বয়েজ স্কুল এবং কয়েকটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েক হাজার শিক্ষার্থী আসাদগেটে অবস্থান নেয়। ওই সময় তারা উল্টোপথে চলা এবং লাইসেন্সবিহীন গাড়ি রুখে দেয়। পথচারীদের সড়ক পারাপারে ফুট ওভারব্রিজ ব্যবহার করতে সচেতন করতেও দেখা গেছে। তবে গাড়ি ভাঙচুর বা অপ্রীতিকর কিছু ঘটেনি। ওই সময় দীর্ঘ যানজট সৃষ্টি হয়।

৯ দফা দাবি সরকার মেনে নেওয়ার পরও রাস্তায় নামার কারণ জানতে চাইলে মোহাম্মদপুর কেন্দ্রীয় কলেজের শিক্ষার্থী বকুল বলেন, ‘সরকারের ঘোষণায় আমরা আস্থা রাখতে পারছি না। কোটা আন্দোলনের সময়ও সরকার দাবি মেনে নিয়েছিল। পরে তা কার্যকর করেনি।’ তিনি আরো বলেন, ‘একদিকে নিরাপদ সড়কের দাবিতে আমাদের আন্দোলন চলছে। অন্যদিকে শিক্ষার্থীদের গাড়িচাপা দেওয়া হচ্ছে। প্রতিদিন কেউ না কেউ রাস্তায় মরছে।’

মনিরুল ইসলাম নামে আরেক শিক্ষার্থী অভিযোগ করেন, শিক্ষার্থীরা রাস্তায় থাকাকালীন শৃঙ্খলা বজায় থাকলেও রাস্তা ছাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আবার বিশৃঙ্খল অবস্থার সৃষ্টি হচ্ছে।

বিকেল ৪টায় আসাদগেটে দেখা যায়, লাইসেন্সবিহীন গাড়ির চালকদের বিরুদ্ধে মামলা করছে পুলিশ। দায়িত্বরত পুলিশ কর্মকর্তা সোহরাব হোসাইন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘দুপুরের পর থেকে এই পর্যন্ত লাইসেন্সবিহীন ১৫ জন গাড়িচালকের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছি।’

একাত্মতা : ছেলেরা আন্দোলনে, এক মা খিচুড়ি রেঁধে এনে খাইয়ে দিচ্ছেন।

খাবার দেন অভিভাবকরা : বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সী আবদুর রউফ, গার্হস্থ্য অর্থনীতি কলেজসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা সকাল ১১টার দিকে নীলক্ষেত মোড় আটকে দেয়। ওই সময় সাংবাদিক ও পুলিশের গাড়িসহ কোনো ধরনের গাড়িই চলতে দেওয়া হয়নি। দুপুর ১টার দিকে নীলক্ষেত মোড়ে গাড়ি ছাড়ায় রিকশাজট বেঁধে যায় নিউ মার্কেট থেকে সায়েন্স ল্যাব পর্যন্ত। ঢাকা কলেজের শিক্ষার্থীরা দীর্ঘ সময় নিয়ে গাড়ির কাগজপত্র দেখায় অল্প সংখ্যক গাড়িতেও জট লেগে যায়। টিচার্স ট্রেনিং কলেজ পর্যন্ত এমন পরিস্থিতি ছিল।

নিউ মার্কেট, সায়েন্স ল্যাব এলাকায় আগের কয়েক দিনের তুলনায় শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি ছিল কয়েক গুণ বেশি। আরমানিটোলা সরকারি কলেজ, বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মদ পাবলিক কলেজ, সিটি কলেজ, আইডিয়াল কলেজ, মোহাম্মদপুর সরকারি কলেজ, শেখ বোরহান উদ্দিন পোস্টগ্র্যাজুয়েট কলেজ, মোহাম্মদপুর কমার্শিয়াল কলেজ, মোহাম্মদপুর কেন্দ্রীয় কলেজ, মোহাম্মদপুর মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজ, বেগম বদরুন্নেসা সরকারি মহিলা কলেজ, ইডেন মহিলা কলেজসহ বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের প্রায় পাঁচ হাজার শিক্ষার্থী আন্দোলনে অংশ নেয়।

সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত অনেক অভিভাবককে খাবার নিয়ে যেতে দেখা যায় আন্দোলনকারীদের জন্য। ফারজানা রহমান নামে ঝিগাতলার এক অভিভবাক বলেন, ‘শুধু দুজন মারা যাওয়ার জন্য এই আন্দোলন নয়। এই আন্দোলন আমার সন্তানের জীবনের নিরাপত্তার জন্য। রাস্তাঘাটে এখন মশা-মাছির মতো মানুষ মরছে। যার সন্তান মরে কয়েক দিন কেঁদে থেমে গেলেও এই সড়ক কিছু সময় পর আরেক পরিবারকে কান্নার সাগরে ফেলে দেয়।’

সকাল সাড়ে ১০টার দিকে সায়েন্স ল্যাবরেটরি এলাকার রাস্তায় শিক্ষার্থীদের সঙ্গে দেখা যায় কয়েকজন মাকে। একজনের হাতে থাকা পোস্টারে লেখা ছিল—‘উই আর উইথ ইউ, টিচার্স ফর স্টুডেন্টস, চিলড্রেনস ফর স্টুডেন্টস।’ আরেকজনের পোস্টারে লেখা, ‘আই এম এ মাদার, আই ওয়ান্ট জাস্টিস।’ আরেক মায়ের হাতে থাকা পোস্টারে লেখা রয়েছে, ‘সাপোর্টিং দ্য ইয়ুথ ইন বিল্ডিং এ সেভ নেশন। উই আর দ্য ৯৯%, বেটার টুমরো।’

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০১৮ সালের বিএড প্রথম সেমিস্টার পরীক্ষার প্রশ্নপত্রবাহী মাইক্রোবাস (ঢাকা মেট্রো-চ-১৫-৮৩৬৫) আটক করা হয়। চালকের ড্রাইভিং লাইসেন্স না থাকায় মামলা দেওয়ার পর যেতে বলে শিক্ষার্থীরা। গাড়ির নিরাপত্তার কাজে নিয়োজিত পুলিশ এবং বরিশালে নিয়োজিত দুজন ম্যাজিস্ট্রেটকে নানা প্রশ্ন করলে তাঁরা দুঃখ প্রকাশ করেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ম্যাজিস্ট্রেট কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা গাড়ি ভাড়া করিনি, করেছে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়। গাড়ির কাগজপত্র ঠিক আছে কি না সেটা জানতাম না। আমাদের জানা উচিত ছিল।’

বেশ কয়েকজন পুলিশ সদস্য তাঁদের মোটরসাইকেলের কাগজ দেখাতে না পারায় সার্জেন্ট ডেকে মামলা করিয়ে ছেড়ে দেয় শিক্ষার্থীরা।

সকালে মিরপুর রোডে কয়েকটি গাড়ি ভাঙচুর করে আটকে রাখে শিক্ষার্থীরা। গাড়িগুলোর মধ্যে ছিল মিরপুর মেট্রো সার্ভিসের একটি, বিহঙ্গ পরিবহনের দুটি, মেঘলা ট্রান্সপোর্টের একটি।

শাহবাগে শিল্পী, অভিনেতা, অভিভাবকদের সংহতি : গতকাল দিনভর শাহবাগ মোড় অবরোধ করে বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করে বিভিন্ন স্কুল-কলেজের হাজারও শিক্ষার্থী। তারা শাহবাগে ঢোকার প্রতিটি রাস্তায় ব্যারিকেড দিয়ে গাড়ির লাইসেন্স পরীক্ষা করে। তাতে হাজির হয়ে সংহতি জানিয়েছেন শিল্পী, অভিনেতা, অভিভাবক, রাজনীতিবিদসহ সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। বিকেল ৪টার দিকে আন্দোলন স্থগিত ঘোষণা করে আজ সকাল ১১টায় আবার শাহবাগে অবস্থানের ঘোষণা দেয় শিক্ষার্থীরা। শাহবাগ ছেড়ে যাওয়ার আগে সেখানে অবস্থানের ফলে জমা হওয়া আবর্জনা পরিষ্কার করে ডাস্টবিনে ফেলে তারা। ওই সময় তারা ৯ দাবি তুলে ধরে।

পরবর্তী কর্মসূচির ঘোষণা দিয়ে মুন্সি আব্দুর রউফ কলেজের শিক্ষার্থী হাসিব হাসান বলেন, ‘আমরা দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাব। এই আন্দোলনের সব দাবি কার্যকর না হওয়া পর্যন্ত আমরা রাজপথে অবস্থান করব। আর এ লক্ষ্যে শুক্রবার সকাল ১১টায় ফের শাহবাগ মোড়ে অবস্থান কর্মসূচি পালন করব।’ প্রত্যেক শিক্ষার্থীকে আন্দোলনে যোগ দিতে পরিচয়পত্র ও স্কুল ড্রেস পরে আসার অনুরোধ জানান তিনি।

ঢাকা কলেজের দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী জাওয়াদ মুন্সি বলেন, ‘আমাদের দেশে কোনো দাবি নিয়ে আন্দোলন হলে প্রথমে দাবি মেনে নেওয়া হয়। কিন্তু পরে তার বাস্তবায়ন হয় না। তাই আমাদের দাবি বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত আমরা আন্দোলন চালিয়ে যাব।’

মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষার্থী সাব্বির রহমান বলে, ‘প্রতিবার আশ্বাসে আন্দোলন বন্ধ হয়ে যায়। দাবি আদায় হয় না। সড়কে মৃত্যুর মিছিল থামে না। তাই এবার দাবি চূড়ান্তভাবে কার্যকর না হওয়া পর্যন্ত আমরা রাজপথ ছাড়ব না।’

শাহবাগে ঢোকার প্রতিটি মোড়ে একটি করে লেন তৈরি করে শিক্ষার্থীরা। ওই মোড়ের চেক পয়েন্টে দাঁড়িয়ে একেকটি দল চালকদের লাইসেন্স যাচাই করে। যেসব চালকের লাইসেন্স ছিল না তাদের পুলিশের হাতে তুলে দিয়েছে তারা। পুলিশ তাদের বিরুদ্ধে মামলাও দিয়েছে। শাহবাগে বিজিবির দুটি গাড়ি আটকায় শিক্ষার্থীরা। ওই গাড়ির চালকরা লাইসেন্স বাসায় থাকার কথা জানালে তাদের লাইসেন্স নিয়ে আসতে বলে শিক্ষার্থীরা। পরে লাইসেন্স দেখালে তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়। দুপুর ১২টার দিকে লাইসেন্স মেয়াদোত্তীর্ণ পাওয়ায় প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিবের গাড়ির চালকের বিরুদ্ধেও মামলা হয়েছে। বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে স্পারসোর সদস্য জাহিদুল ইসলামের গাড়ি আটকায় শিক্ষার্থীরা। গাড়ির লাইসেন্স দেখাতে বললে চালক লাইসেন্সের মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে বলে জানান। পরে তারা গাড়ি আটকে দেয়। এর কিছুক্ষণ আগে লাইসেন্স না থাকায় পুলিশের একটি ভ্যান আটকে লাইসেন্স আনতে পাঠায় শিক্ষার্থীরা। দুপুর ২টার দিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের সামনে শাহবাগ থানার এক পুলিশ সদস্যের লাইসেন্স না থাকায় গাড়ি আটকে দেয় শিক্ষার্থীরা।

ফার্মগেট এলাকার চিত্র : সকাল ১০টার পর থেকেই ফার্মগেট এলাকায় অবস্থান নেয় সরকারি বিজ্ঞান কলেজ, হলিক্রস কলেজসহ বিভিন্ন স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা। সকাল থেকে সন্ধ্যার আগ পর্যন্ত ফার্মগেটের বিভিন্ন পয়েন্টে অবস্থান নিয়ে সড়কের মাঝে বসে তারা আন্দোলন চালিয়ে যায়। ৯ দফা পুরোপুরি বাস্তবায়নের দাবি জানিয়ে ‘ইউ ওয়ান্ট জাস্টিস’ ‘নৌমন্ত্রীর পদত্যাগ চাই’ ‘আমার সহপাঠী মরল কেন, সরকার জবাব চাই’—এ রকম নানা স্লোগান দিচ্ছিল তারা। এ ছাড়া বিভিন্ন প্লাকার্ড ও ফেস্টুন ছিল তাদের হাতে। শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন গাড়ির কাগজপত্র, ফিটনেস সনদ, ড্রাইভিং লাইসেন্স দেখে।

দুপুর দেড়টার দিকে ফার্মগেটে সরকারি বিজ্ঞান কলেজের শিক্ষার্থী নাহিয়ান আরিফ স্বজল বলে, ‘আমরা সকালে ফার্মগেটে অবস্থান নিয়েছি। এই অবস্থান প্রতিনিয়ত চলবে। যতক্ষণ পর্যন্ত আমাদের ৯ দফা সরকার পুরোপুরি মেনে না নেবে, ততক্ষণ এই আন্দোলন চলবে।’

ফার্মগেটের আনোয়ারা পার্কের আশপাশে অবস্থান নেয় তিন-চার শ শিক্ষার্থী। হলিক্রস কলেজের শিক্ষার্থী ফারিহা তালুকদার নিশি বলে, ‘আমি আমার জীবনে কোনো দিন কোনো সভা বা মিছিলে যাইনি। সড়কে যেভাবে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি চলছে, এটি নিয়ন্ত্রণের বাইরে। হাজার হাজার নিষ্পাপ মানুষ প্রাণ হারাচ্ছে অদক্ষ ও বেপরোয়া চালকদের হাতে। এই অদক্ষ ও বেপরোয়া চালকদের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না আসা পর্যন্ত আমরা পথ ছাড়ব না। এ ছাড়া নিহত দুই শিক্ষার্থীর ঘাতকদের ফাঁসি না হওয়া পর্যন্ত এই আন্দোলন চলবে।’

অর্ধেক লাইসেন্সই ঠিক নেই : সকাল ১০টা থেকে আইডিয়াল কলেজ, সিটি কলেজ, শেখ বোরহানুদ্দীন কলেজের ছাত্রদের দেখা মেলে মতিঝিলে। পাঁচ শতাধিক ছাত্র-ছাত্রী শাপলা চত্বর ঘিরে রাস্তা অবরোধ করে রাখে। টিকাটুলীর দিকে মধুমিতা সিনেমা হলের সামনে দুপুর সোয়া ১টার দিকে আবদুর রহমান নামের এক মোটরসাইকেল চালককে আটকে দেয় দুই ছাত্রী। তারা তাঁর ড্রাইভিং লাইসেন্স দেখতে চায়। অবস্থা দেখে হেসে ফেলেন তিনি। পাশ থেকে তিন-চারজন ছাত্র এগিয়ে গিয়ে হাসার কারণ জানতে চাইলে আবদুর রহমান হাসি থামিয়ে ছাত্রদের চাওয়া অনুযায়ী তাঁর মোটরসাইকেলের কাগজপত্র ও ড্রাইভিং লাইসেন্স দেখান। ছাত্ররা ড্রাইভিং লাইসেন্স ঠিক দেখতে পেয়ে তাঁকে ছেড়ে দেয়।

ড্রাইভিং লাইসেন্সের বিষয়ে সিটি কলেজের ছাত্র বাপ্পী বলে, ‘সকাল থেকে ৭০-৮০টা গাড়ি চেক করেছি। এর মধ্যে ২০-৩০টা লাইসেন্স ঠিক পাওয়া গেছে। বাকিদের কারো লাইসেন্সের মেয়াদ চলে গেছে, কারো লাইসেন্স নেই। যাদের লাইসেন্স নেই ও মেয়াদ চলে গেছে এমন কয়েকজন গাড়িচালককে আমরা ট্রাফিক সার্জেন্টের কাছে নিয়ে গিয়েছি। সার্জেন্ট মামলা দিয়েছেন।’