ভোট নয়, পূর্ব শত্রুতার কারনেই সুবর্ণচরের সেই ধর্ষণ: মানবাধিকার কমিশন

প্রকাশিতঃ 3:04 pm | January 13, 2019 |

জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের তথ্যানুসন্ধান প্রতিবেদন বলছে, সুবর্ণচরে ধর্ষণের শিকার নারীকে গুরুতর আঘাত করা এবং তাঁকে ধর্ষণ করার অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া গেছে।

তবে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে এই মারধর ও ধর্ষণের শিকার হওয়ার কোনো সম্পর্ক তদন্তকালে তদন্ত কমিটি খুঁজে পায়নি। বরং ওই নারীর স্বামীর দায়ের করা এজাহারের ভাষ্য মতে, পূর্ব শত্রুতার জেরেই এ ঘটনা ঘটেছে।

এ বিষয়ে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান কাজী রিয়াজুল হক বলেন, কমিশনের তদন্ত কমিটি ধর্ষণ ও গুরুতর আঘাতের সঙ্গে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের কোনো সম্পর্ক আছে বলে প্রমাণ পায়নি।

তবে প্রাথমিকভাবে ওই নারী যে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন, তার সত্যতা মিলেছে। এ ক্ষেত্রে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটেছে। কমিশনের পক্ষ থেকে যথাযথ তদন্ত করে আসামিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনার সুপারিশ করা হয়েছে, ঘটনার সঙ্গে যে বা যারাই জড়িত থাকুক না কেন।

তবে ধর্ষণের শিকার ওই নারী ঘটনার পর থেকে এখন পর্যন্ত বলে আসছেন, ভোটের দিন ধানের শীষে ভোট দেওয়াকে কেন্দ্র করেই তাঁকে দেখে নেওয়ার হুমকি দিয়েছিলেন আসামিরা। ভোটের দিন রাতেই ধর্ষণের ঘটনা ঘটে।

ধর্ষণের শিকার ওই নারী গণমাধ্যমকর্মীদের বলছেন যে তাঁকে নৌকায় ভোট দিতে বলা হলে তিনি জানান ধানের শীষে ভোট দেবেন। তিনি ধানের শীষেই ভোট দেন। তখন একজন বলে, তোর কপালে শনি আছে। তারপর রাতেই ১০ জন মিলে তাঁকে মারধর ও ধর্ষণ করেন।

গতকাল শনিবার রাতে টেলিফোনে ধর্ষণের শিকার ওই নারী বলেন, আগে থেকে শত্রুতা থাকলে আসামিরা তো আগেই ক্ষতি করত। তিনি কোনো দল করেন না দাবি করে বলেন, ভোটকেন্দ্রে গিয়ে তিনি নিজের ইচ্ছেমতো ধানের শীষে ভোট দেন।

তবে ভোটের কাগজ কেমনে করে ভাঁজ করতে হবে বা কোথায় রাখতে হবে, তা জানা না থাকায় সেখানে উপস্থিত মামলার আসামিদের হাতেই তিনি তা দেন। তখন একজন ধমক দিয়ে বলে, সন্ধ্যাকালে খবর আছে।

তবে মানবাধিকার কমিশনের তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ‘মামলার এজাহারে ওই নারীর ধানের শীষের নেতা-কর্মী-সমর্থক হওয়া, তাঁর ধানের শীষে ভোট দেওয়া, আসামিরা নৌকা প্রতীকের নেতা-কর্মী-সমর্থক ও পোলিং এজেন্ট হওয়া, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে নির্বাচনী বিরোধের জের ধরে মারধর বা ধর্ষণের শিকার হওয়া, তা উল্লেখ নেই।

বরং এজাহারে সুস্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে আসামিরা পূর্ব শত্রুতার জের ধরে মারধর ও ধর্ষণ করে। এ ছাড়া ওই নারী তদন্ত কমিটির সামনে দেওয়া জবানবন্দির কোথাও বলেননি যে তিনি ধানের শীষে ভোট দিয়েছেন। তাঁর স্বামীও এসব কথা বলেননি।

’ স্বামী-স্ত্রীর জবানবন্দি থেকেই প্রতিবেদনের উপসংহার হিসেবে বলা হয়েছে, ‘একাদশ সংসদ নির্বাচনে ধানের শীষে ভোট দেওয়া বা ভোট দেওয়ার কারণে এ ঘটনা ঘটেছে বা আসামিরা আওয়ামী লীগের কর্মী হওয়া বা আওয়ামী লীগের কোনো কর্মীর মাধ্যমে ওই নারীকে মারপিট ও ধর্ষণের শিকার হওয়ার প্রমাণ পাওয়া যায় না।’

ঘটনার পর আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) একটি প্রতিনিধি দল পাঠায় সুবর্ণচরে। এ দল ফিরে এসে লিখিত প্রতিবেদন দেয়নি। তবে আসকের নির্বাহী পরিচালক শীপা হাফিজা বলেন, ‘আমাদের প্রতিনিধি দলকে ধর্ষণের শিকার নারী পূর্বশত্রুতার জেরের কথা যেমন বলেছেন, তেমনি ভোটের দিনের ঘটনাও বলেছেন।’

জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের তথ্যানুসন্ধান প্রতিবেদনের কপি আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের সচিব বরাবর পাঠানো হয়েছে।

গত ১ জানুয়ারি মানবাধিকার কমিশনের পক্ষ থেকে কমিশনের সম্মেলনকক্ষে নির্বাচন সংক্রান্ত এক সংবাদ সম্মেলনে সুবর্ণচরের ঘটনার বিষয়ে কমিশনের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়।

কমিশনের চেয়ারম্যান কাজী রিয়াজুল হক তাৎক্ষণিকভাবে কমিশনের পরিচালক (অভিযোগ ও তদন্ত, জেলা ও দায়রা জজ) এর নেতৃত্বে তিন সদস্য বিশিষ্ট তথ্যানুসন্ধান কমিটি গঠন করেন।

এই দল পরের দিনই ঘটনাস্থলে গিয়ে ওই নারী, নারীর স্বামী, থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা, নোয়াখালী জেনারেল হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসক, পুলিশ সুপার, জেলা প্রশাসকসহ সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলেন। এরপর কমিটি কমিশনের চেয়ারম্যানকে প্রতিবেদনটি জমা দেয়। এই প্রতিবেদনের কপি কমিশনের ওয়েবসাইটে আছে।

কমিশনের প্রতিবেদনে হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসক সৈয়দ মহিউদ্দিন আবদুল আজিমের জবানবন্দি, ইনজুরি সার্টিফিকেট, এক্স-রে প্রতিবেদন, থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাসহ সবার বক্তব্য উল্লেখ করা হয়েছে। সব বক্তব্য বিশ্লেষণ করে কমিশনের তদন্ত কমিটি যে মতামত দিয়েছে তা হলো, ওই নারীকে গুরুতর জখম করা হয়েছে এবং ধর্ষণ করা হয়েছে।